‘ বৈঠকে বিরোধী ঐক্যের রূপরেখা বোঝাতে গিয়ে কেরলের উদাহরণ টেনে আনেন রাহুল গান্ধী। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, কেরলে কংগ্রেস ও বামেরা পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়লেও দিল্লিতে তারা একজোট। জাতীয় রাজনীতির বৃহত্তর দায়বদ্ধতার কথা যেন কোনও রাজনৈতিক দলই ভুলে না যায়, সেই বার্তাই দেন রাহুল।
আমার কোনও ইগো নেই', রাহুল গান্ধীকেই প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেখতে চান মমতা
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাহুল গান্ধী
রাহুল গান্ধীর প্রধানমন্ত্রিত্বে আপত্তি নেই মমতার! ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে সরাসরি বুঝিয়ে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। আঁচটা মিলেছিল বুধবার সকালেই। যখন বৈঠকের মাঝে ভোটচুরির প্রতিবাদ প্রসঙ্গে মমতার মুখে শোনা গিয়েছিল রাহুলের নাম। যেখানে একবারও ওঠেনি অভিষেক প্রসঙ্গও। এতদিন ঠিক যে জায়গায় উঠেছে যাবতীয় টানাপোড়েন, আপত্তি, দর কষাকষি, ঠিক সেই জায়গাতেই কয়েক মাসের ব্যবধানে নমনীয় হতে দেখা গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বিশ্লেষকদের মতে, লড়াকু নেত্রী যেন মাথা ঝোকালেন পরিস্থিতির চাপে!
ঠিক কী আলোচনা হয়?
বিগ বসের ঘরে যা বলা যায়নি, বাইরে এসে সেটাই বললেন সায়ক-সোহিনী-অ্যালেক্স?
সূত্রের খবর, ইন্ডিয়া জোটের কনস্টিটিউশন ক্লাবের বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘কংগ্রেসই প্রধানমন্ত্রীর পদ পেতে পারে। এ বিষয়ে আমার কোনও ইগো নেই। শুধু সকলের সহমত নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে তখন পাল্টা বলেন, “কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রীর পদ বা ক্ষমতার জন্য লড়াই করছে না। কংগ্রেস দেশ এবং গণতন্ত্র বাঁচাতে চায়।”
মমতার ‘সুবিধাবাদী’ রাজনীতি
কখনও NDA, কখনও আবার সুবিধা বুঝে UPA! নিজের কেরিয়ারে একাধিকবার অবস্থান বদলাতে দেখা গিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কিন্তু তৃণমূলের এই অবস্থান বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিচার করতে গেলে, ঠিক কয়েকটা দিন পিছিয়ে যেতে হবে। ইন্ডিয়া জোট গঠনের শুরুর দিনগুলিতে তৃণমূলের স্পষ্ট সুর ছিল—নরেন্দ্র মোদীর মুখোমুখি দাঁড়াতে গেলে বিরোধী জোটের প্রধান মুখ হওয়া উচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই। অর্থাৎ মমতাই ‘বিকল্প’ মুখ। তৃণমূল নেতৃত্বের স্পষ্ট দাবি ছিল, দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং জাতীয় স্তরে সর্বজনগ্রাহ্য পপুলারিটির বিচারে রাহুল গান্ধীর থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক এগিয়ে। এমনকি SIR-এর সময়ে রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক পারদর্শিতা-বিচক্ষণতা নিয়ে কার্যত প্রশ্ন তুলতেই দেখা যায় অভিষেককে। সেই সময় জোটে কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য কিংবা রাহুল গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী মুখ হিসেবে তুলে ধরার প্রশ্নে তৃণমূলের তীব্র আপত্তি ছিল। কিন্তু এখন বদলে গিয়েছে গোটা সমীকরণটাই।
প্রদেশ কংগ্রেস নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য বলেন, “মমতা বুঝতে পেরেছেন, বিরোধী দলগুলিকে যদি একজোট করে এক ছাতার তলায় আনতেই পারে, কিংবা বিরোধীদের মধ্যে এখনকার পরিস্থিতিতে যে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী, সেটাই জাতীয় কংগ্রেস। রাহুল গান্ধীই প্রথম ভোটচুরির স্লোগান দিয়ে সারা ভারতের মানুষকে বুঝিয়েছিলেন। তাই মমতাকে সেটা মানতেই হল।”
সহানুভূতি আদায় মমতার
পশ্চিমবঙ্গে SIR এবং তৃণমূলের ভাঙ্গনকে ইস্যু করেছে সব বিরোধী দলই। বাংলায় ভোটচুরির অভিযোগে রাহুল-সহ একাধিক বিরোধী নেতার সহানুভূতি আদায় করেছেন মমতা। দক্ষিণ কলকাতায় আগুন লেগে ইভিএম পুড়ে যাওয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করে মমতার ভোট চুরির অভিযোগকে সমর্থন করেন রাহুল।
রাহুলের বার্তা ও ভোটচুরির অভিযোগ
বৈঠকে বিরোধী ঐক্যের রূপরেখা বোঝাতে গিয়ে কেরলের উদাহরণ টেনে আনেন রাহুল গান্ধী। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, কেরলে কংগ্রেস ও বামেরা পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়লেও দিল্লিতে তারা একজোট। জাতীয় রাজনীতির বৃহত্তর দায়বদ্ধতার কথা যেন কোনো রাজনৈতিক দলই ভুলে না যায়, সেই বার্তাই দেন রাহুল।
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয় ও SIR প্রক্রিয়া নিয়ে সরব হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দক্ষিণ কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে ইভিএম পুড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে মমতা দাবি করেন, এই প্রক্রিয়ায় তিনি নিজে ‘বিগেস্ট সাফারার’ বা সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। মমতার ভোটচুরির অভিযোগ সমর্থন করেন বিহারের বিরোধী নেতা তেজস্বী যাদব। অন্যদিকে, রাহুল গান্ধী মমতার বক্তব্য সমর্থন করে বলেন, “বিরোধী দলগুলি সাফারার ঠিকই, তবে এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।”
তৃণমূল ভাঙন ও অন্যান্য বিরোধী নেতাদের অবস্থান
তৃণমূলের অভ্যন্তরে ভাঙন সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগ তুলে শিবসেনা (উদ্ধব গোষ্ঠী) নেতা উদ্ধব ঠাকরে বলেন, “আমার পার্টির সঙ্গে যেভাবে ছক কষে দল ভাঙা হয়েছিল, এখন তৃণমূলের সঙ্গেও ঠিক সেটাই করা হচ্ছে।” পশ্চিমবঙ্গের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রায় চার মিনিট বক্তব্য রাখেন ওমর আব্দুল্লা। পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে সমাজবাদী পার্টির নেতা হরেন্দ্র মালিক বলেন, বিরোধী ঐক্যকে আরও সুসংহত ও শক্তিশালী করতে এবার কংগ্রেসকেই মূল দায়িত্ব নিতে হবে।
SIR প্রক্রিয়ায় ‘Biggest sufferer’ বা সবথেকে বড় ভুক্তভোগী হিসেবে নিজেকে দাবি করেন মমতা। পরে নিজের বক্তব্যের সময় রাহুল গান্ধী বলেন, “সব বিরোধী দলই ভুক্তভোগী। সব থেকে বেশি ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।” তখন মমতার ভোট চুরির অভিযোগকে সমর্থন করেন তেজস্বী যাদব।
কথার মাঝেই তৃণমূলকে টুকরো করার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন উদ্ধব ঠাকরে। তাঁর দাবি, “আমার পার্টির সঙ্গে যা করা হয়েছিল, এখন তার তৃণমূলের সঙ্গে হচ্ছে।” পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি নিয়ে টানা চার মিনিট বক্তব্য রাখেন ওমর আব্দুল্লা।
মমতার বক্তব্যকে সমর্থন করে সমাজবাদী পার্টির নেতা হরেন্দ্র মালিক বলেন, বিরোধী ঐক্য সুসংহত করতে কংগ্রেসকে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। গতকালের বৈঠকে সোনিয়া গান্ধীকে আলাদাভাবে একটি ‘স্টোলও’ গিফট করেছেন মমতা।


Post A Comment:
0 comments so far,add yours