যে বিজেপি কথায় কথায় ভাতা নিয়ে তৃণমূলকে খোঁচা দিয়ে থাকে, তাঁরাও সেই ভাতার পথেই হাঁটলেন? না, এ ক্ষেত্রে বিজেপির সঙ্কল্পপত্রে রয়েছে চাকরির কথাও। চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। সরকারি পরিবহণে মহিলাদের জন্য থাকবে বিনামূল্যে যাতায়াতের সুবিধা।
বাংলার মহিলাদের উপর 'লক্ষ্মীর' কতটা কৃপা? কার ঝুলিতে কী আছে
বাংলার ইস্তাহার
বাসে উঠবেন। কিন্তু ভাড়া দিতে হবে না। মাস গেলে অ্যাকাউন্টে ঢুকবে ৩০০০ টাকা। এটা পছন্দ? নাকি মাসে মাসে ১৫০০ টাকা করে পেলেই আপনি খুশি? চয়েস আপনার। চাকরি না বেকার ভাতা? নিরাপত্তা নাকি সংরক্ষণ, কোনটা চাই? বাংলায় এখন প্রতিশ্রুতির হাওয়া। কেউ বলছেন, ১৫০০, কেউ বলছেন ৩০০০, কেউ ৬০০০! ভোটের অঙ্ক মেলানোর আগে ইস্তাহারের পাতায় চলছে যোগ-বিয়োগ। ভোটবাক্সে পছন্দের ‘অপশন’ বেছে নেওয়ার আগে আপনারাও জেনে নিন, কার ঝুলিতে কী আছে এবার?
কেউ নাম দিয়েছেন প্রতিজ্ঞা, কেউ বলছে সংকল্প। আসলে সবটাই নির্বাচনের ইস্তাহার। ক্ষমতায় এলে কী কী করবেন? কেন তাঁদেরকেই ভোটটা দেবেন, তারই প্রতিশ্রুতি থাকে ইস্তাহারে। ২০২৬-এর নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলার সব রাজনৈতিক দল ইতিমধ্যেই ইস্তাহার প্রকাশ করে ফেলেছে।
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে ED, নাকতলার বাড়ি ঘিরে ফেলল সেন্ট্রাল ফোর্স
বিশ্লেষকরা বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিনবার ক্ষমতায় আসার পিছনে মহিলা ভোট একটা বড় ভূমিকা নিয়েছে। এসআইআরে কত মহিলা ভোটারের নাম বাদ গেল, তার নিরিখে ইতিমধ্যে হিসেব কষতে শুরু করে দিয়েছে সব রাজনৈতিক দলগুলি। আর সব দলের ইস্তাহারে চোখ রাখলেই বোঝা যাবে সেই মহিলা ভোটই পাখির চোখ। প্রায় সবাই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের থেকে অঙ্কটা বাড়িয়েই রেখেছেন। কংগ্রেসের ইস্তাহারে বলা হয়েছে, মহিলাদের ২০০০ টাকা ভাতার কথা, সেখানে কোনও বাছবিছার থাকছে না। তৃণমূল ভোটের মুখেই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা ১০০০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০০ করেছে, তাই ইস্তাহারে আর কোনও নতুন প্রতিশ্রুতি নেই। তবে বিজেপির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, সেই অঙ্ক হবে দ্বিগুণ। ৩০০০ টাকা। তবে বেকার মহিলারাই এই টাকা পাবেন।
যে বিজেপি কথায় কথায় ভাতা নিয়ে তৃণমূলকে খোঁচা দিয়ে থাকে, তাঁরাও সেই ভাতার পথেই হাঁটলেন? না, এ ক্ষেত্রে বিজেপির সঙ্কল্পপত্রে রয়েছে চাকরির কথাও। চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। সরকারি পরিবহণে মহিলাদের জন্য থাকবে বিনামূল্যে যাতায়াতের সুবিধা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ১০০-র বেশি স্কিম তৈরি করেছেন এই কয়েক বছরে। রয়েছে স্বাস্থ্যসাথী, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী। তৃণমূলকে চ্যালেঞ্জ করতে তাই বিজেপি কোনও ক্ষেত্রই বাদ দেয়নি। তৃণমূলের যেখানে আছে রূপশ্রী, যাতে বিয়ের টাকা দেওয়া হয়, সেখানে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে গর্ভবতী মহিলাদের টাকা দেওয়া হবে। আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের মহিলাদের জন্য গর্ভবতী থাকাকালীন ২১ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা এবং ৬টি পুষ্টি সরঞ্জাম দেওয়ার কথা বলা হয়েছে ইস্তাহারে। বিজেপি আরও বলছে, তারা ক্ষমতায় এলে কলেজে ভর্তির সময় একজন অবিবাহিত মহিলা পাবেন ৫০,০০০ টাকা। তৃণমূল সরকারের কন্যাশ্রী প্রকল্পে, ১৮ বছর বয়সে দেওয়া হয় ২৫,০০০ টাকা। অর্থাৎ এখানেও সেই অঙ্কের হিসেব। তবে সিপিএমের ইস্তাহারের পাতায় কোনও ভাতার প্রতিশ্রুতি নেই। শুধুই স্বনির্ভর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ৫ বছরের মধ্যে ২০ লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করতে চায় বামেরা।
আরজি কর-কাণ্ডকে সামনে রেখে বিরোধীরা যখন বারবার শাসকের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছে, তারপর প্রতিশ্রুতির ঝুলিতে নারী নিরাপত্তার কথা তো থাকবেই। প্রতি থানায় একটি করে ‘নারী সহায়তা ডেস্ক’, মহিলা পুলিশের বিশেষ ‘দুর্গা সুরক্ষা বাহিনী’ গঠন এবং মাতঙ্গিনী হাজরা এবং রানি শিরোমণির নামে দু’টি বিশেষ ব্যাটেলিয়ন তৈরির ঘোষণাও করেছে বিজেপি। সিপিএম বলছে, ক্ষমতায় এলে তৈরি হবে স্বশাসিত অভয়া বাহিনী। তবে তৃণমূলের প্রতিজ্ঞায় এমন কিছু নেই।
তবে শুধু মহিলা ভোটে তো আর বাক্স ভরবে না। ভোট চাই কৃষকের, ভোট চাই বেকারের। ভোটের মুখেই রাজ্য বাজেটে যুবসাথী ঘোষণা করে সাড়া ফেলে দিয়েছিল মমতা সরকার। তবে তৃণমূলের যদি থাকে ভাতা, বিজেপির আছে উৎসাহ। কর্মসংস্থান না-হওয়া পর্যন্ত মাসে তিন হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। যুবসাথীর দ্বিগুণ। আর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় যাঁরা অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক হলে এককালীন ১৫ হাজার টাকা ‘উৎসাহ ভাতা’ দেওয়া হবে। সিপিএম অবশ্য কথায় কথায় ভাতা দেওয়ার পক্ষপাতি নয়। তাদের ইস্তাহারেও সেটা পরিষ্কার। তবে ৬০০০ টাকা বার্ধক্য ভাতা দেওয়ার কথা বলেছে সিপিএম। বছরে দুটি করে চাকরির কল দেওয়ার কথা বলা হয়েছে সিপিএমের ইস্তাহারে।
বেকারদের টাকা দেওয়ার কথা তো আছেই, সেই সঙ্গে চাকরির আশ্বাস। নাহলে যুব সম্প্রদায়ের মন পাওয়া যাবে কী করে! তৃণমূল আমলে চাকরি বাতিল বা কর্মসংস্থান না হওয়ার মতো বিষয় একটা বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিরোধীরা বলছে, ক্ষমতায় এলেই হবে ভূরি ভূরি চাকরি। পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছে বিজেপি। কংগ্রেস বলছে, এক বছরের মধ্যে সরকারি দফতরের সমস্ত শূন্যপদ পূরণ করে দেওয়া হবে, দেওয়া হবে ইন্টার্নশিপের সুযোগ। সব সরকারি ভ্যাকান্সি পূরণ করতে সিপিএম চায় ৫ বছর সময়। সেইসঙ্গে সিপিএমের ঝুলিতে আছে স্বচ্ছ এসএসসি , পিএসসি পরীক্ষার কথা।
সরকারি দফতর না হয় হল, বাকি চাকরি কোথায় হবে? বিরোধীদের ইস্তাহারে শিল্পের কথা। শিল্পের আশ্বাস দিচ্ছেন মমতাও। শালবনিতে জিন্দলদের বিনিয়োগ, রঘুনাথপুরে ৭২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা বলেছেন মমতা। বিজেপি বলছে, তাজপুরে হবে সমুদ্র বন্দর। সঙ্গে সিঙ্গুরের শিল্প পার্ক, হলদিয়া বন্দরের উন্নয়নের কথাও রয়েছে। এছাড়াও কৃষির জন্য বরাদ্দ, ডিএ মেটানোর কথা, দুর্নীতির তদন্তের আশ্বাস এসব তো আছেই।
তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস- সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রই ছুঁয়ে গিয়েছে। পুরুষ, মহিলা, কৃষক, শ্রমিক- সবাই তো পেল আশ্বাস। তৃণমূল বলছে ১০ লক্ষ চাকরি, বিজেপি বলছে ১ কোটি কিন্তু আশ্বাসে তো আর পেট ভরে না! ভোটের আগে বলা কথা ভোটের পর আদৌ ফলবে তো? এ এক চিরন্তন সংশয়। মুখের কথায় কি আর চিঁড়ে ভিজবে? তাই কাদের আশ্বাসে আমজনতার মন ভরবে, কাদের উপর ভরসা রাখবেন, তা বলা কঠিন। অপেক্ষা সেই ফোর্থ মে-র