বর্তমান যান্ত্রিক ও স্বার্থপরতার যুগে দাঁড়িয়েও মানুষের মনে যে মনুষ্যত্ব ও দয়া নামক অমূল্য রত্নটি বেঁচে রয়েছে, তার এক উজ্জ্বল ও হৃদয়ছোঁয়া ছবি ধরা পড়ল সুন্দরবনের প্রত্যন্ত দ্বীপাঞ্চল সাগরদ্বীপে।দুবেলা দুমুঠো অন্নের জন্য যেখানে প্রতিনিয়ত লড়াই চালাতে হয়, ঠিক সেই চরম অর্থনৈতিক সংগ্রামকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এলাকার বয়স্ক, অসুস্থ এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এক নজিরবিহীন মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন স্থানীয় এক টোটো চালক। 


নিজের সমস্ত প্রতিকূলতা আর অভাব অনটনকে দূরে সরিয়ে রেখে প্রবীণদের যাতায়াতের কষ্ট লাঘব করতে তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা বর্তমানে গোটা সাগরদ্বীপ জুড়েই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং সর্বস্তরের মানুষের মন জয় করে নিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, এই প্রশংসনীয় ও মহৎ উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন সাগরদ্বীপের কৃষ্ণনগর এলাকার বাসিন্দা তথা পেশায় টোটো চালক স্বপন কুমার নাথ।


 পেটের টানে এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে একসময় ভিন রাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। ভিন রাজ্যের হাড়ভাঙা খাটুনি, প্রতিকূল পরিবেশ আর দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিকথা শেষ করে কিছুদিন আগেই নিজের ভিটেমাটিতে ফিরে আসেন স্বপনবাবু। বাড়িতে ফেরার পর তিনি পরিবারকে সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং স্থির করেন যে আর বাইরে কোথাও পাড়ি দেবেন না, নিজের এলাকাতেই কিছু একটা করে খাবেন। কিন্তু কঠিন বাস্তবতায় সংসার চালাতে গেলে তো নির্দিষ্ট ও নিয়মিত আয়ের প্রয়োজন।উপায় না পেয়ে তিনি স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে দৈনিক একশো টাকা ভাড়ার চুক্তিতে একটি টোটো সংগ্রহ করেন এবং তা চালাতে শুরু করেন। টোটো নিয়ে প্রতিদিনের মতো রাস্তায় নামার পর থেকেই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান স্বপনবাবু।তিনি অত্যন্ত গভীরভাবে লক্ষ্য করেন যে, সমাজের অধিকাংশ ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ এবং গরিব মানুষ চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। সামান্য ওষুধ কেনা, নিয়মিত ডাক্তার দেখাতে যাওয়া কিংবা হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা বাজারে যাতায়াত করা— প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁদের আর্থিক অনটনের বড়সড় মুখোমুখি হতে হয়। এর মধ্যে প্রবীণদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় গাড়ি ভাড়া জোগাড় করা। বয়স্ক মানুষদের এই অসহায় ও করুণ অবস্থা স্বপনবাবুর মনে গভীর রেখাপাত করে। তিনি মনে মনে চিন্তা করেন, যদি অন্তত এই যাতায়াতের গাড়ি ভাড়ার দুশ্চিন্তা ও আর্থিক চাপ থেকে তাঁদের কিছুটা মুক্ত করা যায়, তবে হয়তো বয়স্ক মানুষগুলোর কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হতে পারে। এই গভীর মহৎ ভাবনা থেকেই তিনি তাঁর টোটোটিকে একটু অন্যভাবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন। নিজের আয়ের কথা না ভেবে তিনি টোটোর গায়ে বড় বড় হরফে ও স্পষ্ট অক্ষরে লিখে দেন— "ফ্রী পরিষেবা ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে গরীব অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য"।দেখতে দেখতে আড়াই মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে, আর এই দীর্ঘ সময়ে তিনি তাঁর এই অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি এক মুহূর্তের জন্যও ভোলেননি। স্বপনবাবু জানান, তাঁর টোটোয় ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে যে কোনো বয়স্ক বা অসুস্থ ব্যক্তি উঠলে তিনি বিন্দুমাত্র ভাড়া নেন না। তাঁরা চিকিৎসার প্রয়োজনে বাইরে যেতে চাইলে, বাজারে বা দৈনন্দিন জরুরি কাজে বের হলে, এমনকি দূরদূরান্তে কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যেতে চাইলেও তিনি তাঁদের হাসিমুখে নিখরচায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেন।এদিকে, টোটোর মালিককে প্রতিদিনের নির্ধারিত একশো টাকা ভাড়া মিটিয়ে যেটুকু সামান্য রোজগার হাতে থাকে, তা দিয়েই তাঁর ছোট সংসারটির চাল-ডাল ও বাজার-হাট কোনোমতে চলে যায়। তবে টাকা বা মুনাফা কামানোর চেয়েও সাধারণ মানুষের মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে এবং তাঁদের নিঃস্বার্থ সেবা করে তিনি যে মানসিক শান্তি ও তৃপ্তি পান, তার সাথে কোনো কিছুরই তুলনা হয় না বলে সগর্বে জানান এই টোটো চালক। সাগরদ্বীপের পিচঢালা পথ কিংবা গ্রামীণ মেঠো রাস্তায় এই বিশেষ বার্তা লেখা টোটোটিকে নিয়মিত ঘুরে বেড়াতে দেখলে এলাকার সাধারণ মানুষ দুহাত তুলে তাঁকে আশীর্বাদ করেন।এলাকাবাসীদের মতে, স্বপনবাবুর মতো এমন একজন সাধারণ হৃদয়ের টোটো চালক প্রমাণ করে দিয়েছেন যে সেবা করার জন্য অঢেল সম্পত্তির প্রয়োজন হয় না, কেবল বড় একটি মনের প্রয়োজন হয়। তাঁর এই মানবিক প্রচেষ্টাকে কুর্নিশ জানিয়েছেন স্থানীয় বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক সমাজ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। স্বপনবাবু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যতদিন তাঁর শরীর সুস্থ থাকবে এবং টোটো চালানোর মতো শারীরিক সামর্থ্য থাকবে, ততদিন তিনি এই বিনামূল্যে পরিষেবা নিঃস্বার্থভাবে চালিয়ে যাবেন। তাঁর এই ছোট্ট অথচ অত্যন্ত মহৎ উদ্যোগ শুধু সাগরদ্বীপ নয়, গোটা রাজ্যবাসীর কাছেই এক বড় অনুপ্রেরণা ও মানবতার জীবন্ত দলিল হয়ে রইল।
Share To:

kakdwip.com

Post A Comment:

0 comments so far,add yours