বিতর্ক এখন আর কাগজপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ৩২ শতক জমিতে দুই পক্ষের তরফেই পৃথক বোর্ড লাগানো হয়েছে। ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে পাশাপাশি থাকা সেই দুই বোর্ড এখন পথচলতি মানুষেরও নজর কাড়ছে। সব মিলিয়ে ১১ শতক জমিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিলতার গোলকধাঁধা।


একটাই জমি দুই বিজেপি বিধায়কের নামে! কল্যাণী বিমানবন্দর তৈরির আবহে শুরু 'অসীম লড়াই'
কী বলছেন অসীম কুমার বিশ্বাস ও অসীম সরকার?

একই দল। একই জেলার দুই বিধায়ক। ব্যক্তিগত সম্পর্কেও নাকি চিড় ধরেনি। কিন্তু জমির সীমানায় এসে সেই সম্পর্কেই যেন টান পড়েছে। ৩২ শতক জমির একেবারে মাঝখানে থাকা ১১ শতক জমিকে ঘিরে রানাঘাট দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক অসীম কুমার বিশ্বাস এবং হরিণঘাটার বিজেপি বিধায়ক অসীম সরকারের মধ্যে শুরু হয়েছে মালিকানা নিয়ে টানাপোড়েন। একাধিক দফায় আলোচনা করেও জট না কাটায় শেষ পর্যন্ত বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও জানানো হয়েছে বলে দাবি দুই বিধায়কের। তবে দুই বিধায়কের বক্তব্যেই একটি বিষয় স্পষ্ট, ‘জমি নিয়ে ঝামেলা আছে, ব্যক্তিগত ঝামেলা নেই।’


নদিয়ার চাকদহ থানার শিমুরালির নরপতিপাড়া মৌজায় ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে অবস্থিত ওই জমি। বিতর্কিত ১১ শতক জমিটি ৮৯০ নম্বর খতিয়ানের অন্তর্গত বলে জানা গিয়েছে। এলাকাটি জাতীয় সড়কের পাশে এবং এখানে বিমানবন্দর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে জমির দাম দ্রুত বাড়ায় এই জমি ঘিরে টানাপোড়েনও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।




রানাঘাট দক্ষিণের বিধায়ক অসীম কুমার বিশ্বাসের দাবি, বিতর্কিত ১১ শতক জমি তিনি ২০২১ সালেই কিনেছেন। রেকর্ড এবং সেল ডিড খতিয়ে দেখেই জমি কেনা হয়েছিল বলে তাঁর বক্তব্য। তাঁর কাছে জমি কেনার যাবতীয় নথিও রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। অসীম কুমার বিশ্বাসের কথায়, “আমার সঙ্গে ওঁর (অসীম সরকারের) কোনও ব্যক্তিগত ঝামেলা নেই। ঝামেলা ওই ১১ শতক জমিটাকে নিয়ে। আমি রেকর্ড দেখে, চেন ডিডের মাধ্যমে জমি কিনেছি। আমারটা জাল না ওঁরটা জাল—সেটা আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে।” তাঁর মতে, রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজনে বিএলআরও-র নথি খতিয়ে দেখলেই প্রকৃত মালিকানা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

কী বলছেন অসীম সরকার?

অন্য গল্প শোনালেন হরিণঘাটার বিধায়ক অসীম সরকার। তাঁর দাবি, বিতর্কিত জমিটির পূর্বতন মালিক ছিলেন যমুনা রানি দত্ত। ১৯৮৯ সালে তিনি আবুল হোসেন তরফদারের কাছে জমিটি বিক্রি করেন। আবুল হোসেন ওই জমিতে চাষ করতেন এবং জমির কিছু অংশ বর্গা হিসেবেও রেকর্ড ছিল বলে দাবি তাঁর। পরবর্তীকালে আবুল হোসেন তরফদার অশোক বিশ্বাস নামে এক ব্যক্তিকে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দেন। কিন্তু পাওয়ারনামা করার মাত্র তিন মাসের মধ্যে আবুল হোসেনের মৃত্যু হওয়ায় সেই পাওয়ারনামা বাতিল হয়ে যায় বলে দাবি অসীম সরকারের।

তাঁর বক্তব্য, আবুল হোসেনের তিন পুত্র-কন্যা পরবর্তী সময়ে জমিটির মালিকানা নিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর বিষয়টি বিএলআরও-র কাছেও নিয়ে যাওয়া হয়। বিএলআরও-র কথা মতো জমির কাগজপত্র খতিয়ে দেখে গত ২৫ অগস্ট কল্যাণীতে রেজিস্ট্রি করে তিনি মোট ৩২ শতক জমি কেনেন। কিন্তু রেজিস্ট্রির দিনই জমি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। তাঁর অভিযোগ, অসীম কুমার বিশ্বাসের নেতৃত্বে একদল লোক সেখানে গিয়ে জমি রেজিস্ট্রিতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

এমনকি বিতর্কিত ১১ শতক জমি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের তরফে তাঁকে বিবাদে না জড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেছেন হরিণঘাটার বিধায়ক। তাঁর বক্তব্য, যাঁরা অসীম কুমার বিশ্বাসকে ওই ১১ শতক জমি বিক্রি করেছিলেন, তারা ৩৬ লক্ষ টাকা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল। অসীম সরকারের দাবি, “আমি যতক্ষণ ওই ১১ শতক জমি লিখে না দিচ্ছি, ততক্ষণ উনি ওই জমির মালিক হতে পারবেন না।”

এমনকি বিষয়টি জানার পরও অসীম কুমার বিশ্বাস নতুন করে কৃষ্ণনগরে ওই জমি পুনরায় দলিল করেছেন বলেও অভিযোগ অসীম সরকারের। তাঁর বক্তব্য, “উনি যে আবার ২৫ তারিখ নিজের নামে রেজিস্ট্রি করেছেন, সেটা ভালো হয়নি। অত্যন্ত বোকামি হয়েছে। তবে উনি সহজ-সরল মানুষ। ওঁকে দিয়ে কেউ এটা করিয়েছেন।” 

অবশ্য সেই অভিযোগ একেবারেই মানতে নারাজ অসীম কুমার বিশ্বাস। তাঁর পাল্টা প্রশ্ন, “জমি আমি ২০২১ সালে কিনেছি, তাহলে পরবর্তীকালে অসীম সরকার জেনেশুনে ওই জমি কিনতে গেলেন কেন?” তাঁর দাবি, গোটা ঘটনাটিই মূলত ভুল বোঝাবুঝি এবং যোগাযোগের ঘাটতি থেকে তৈরি হয়েছে।

শুনুন কী বলছেন দুই বিধায়ক?



বিতর্ক এখন আর কাগজপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ৩২ শতক জমিতে দুই পক্ষের তরফেই পৃথক বোর্ড লাগানো হয়েছে। ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে পাশাপাশি থাকা সেই দুই বোর্ড এখন পথচলতি মানুষেরও নজর কাড়ছে। সব মিলিয়ে ১১ শতক জমিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিলতার গোলকধাঁধা।

এদিকে নদিয়ার এই এলাকায় জাতীয় সড়ক ও বিমানবন্দরকে ঘিরে জমির মূল্য দ্রুত বাড়ায় জমি কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে আগ্রহ যেমন বেড়েছে, তেমনই জমি মাফিয়াদের সক্রিয়তা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। ফলে দুই বিধায়কের জমি-বিতর্ক রাজনৈতিক মহলেও বাড়তি কৌতূহল তৈরি করেছে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই, ৩২ শতকের মাঝখানে থাকা সেই ১১ শতক জমি আসলে কার?


Share To:

kakdwip.com

Post A Comment:

0 comments so far,add yours