বিরোধী দলনেতা নির্বাচন ও সই জাল-কাণ্ডে স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসুর ভূমিকা প্রশ্নের মুখে। বিচারপতির প্রশ্ন, কোন রাজনৈতিক দলের কথা না শুনে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের কথা কি গ্রহণ করা যায়? প্রথমে যে প্রস্তাব আসে, সেটা দেখেও সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণ কী, জানতে চাইল হাইকোর্ট।
'বহিষ্কৃত' ঋতব্রতকে কেন বিরোধী দলনেতা বাছলেন? FIR হলেই জালিয়াত বলা যায়? স্পিকারকে পরপর প্রশ্ন বিচারপতির
বিরোধী দলনেতা বাছাইয়ের মামলা
রাজ্য বিধানসভা বিরোধী দলনেতা নির্বাচন সংক্রান্ত মামলায় ফের একগুচ্ছ প্রশ্ন তুলল আদালত। স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুললেন কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) বিচারপতি কৃষ্ণা রাও। তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে একটি চিঠি দিয়ে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার কথা বলা হয়েছিল। অন্যদিকে, বিধায়ক সন্দীপন সাহা ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন দেখিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার কথা বলেন। বৃহস্পতিবার বিধানসভার অধিবেশন রয়েছে। তার আগে শুনানি শেষ হলেও, রায়দান স্থগিত রইল।
কেন মামলার সূত্রপাত
বাংলায় পালাবদলের পর এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বাংলায়। বিরোধী দল তৃণমূল শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে বেছে নিয়ে চিঠি দেয় স্পিকারকে। এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। পরে একদল বিধায়ক নিজেদের বিক্ষুব্ধ হিসেবে দাবি করে সোজা চলে যান স্পিকারের কাছে। তাঁদের প্রস্তাব অনুযায়ী বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত। আর সেই প্রস্তাবই মান্যতা পায় স্পিকারের কাছে। শুধু তাই নয়, কালীঘাট থেকে তৃণমূলের দেওয়া চিঠিতে অনেক বিধায়কের সই জাল করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
..বোরখা পরে ডিম ছুড়ুন', এমন কথা বলতেই মহুয়ার বিরুদ্ধে বড় পদক্ষেপ
বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের প্রশ্ন
কোনও রাজনৈতিক দলের কথা না শুনে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের কথাই কি গ্রহণ করা যায়?
প্রথম আসা প্রস্তাব দেখেও সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণ কী?
এলওপি বাছাই নিয়ে স্পিকারের বক্তব্য
স্পিকারের তরফে আইনজীবী (অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল) বিল্বদল ভট্টাচার্য জানান, তৃণমূলের পাঠানো চিঠিতে বিধায়ক দলের বৈঠকের কোনও উল্লেখ নেই। তাই স্পিকার বৈঠকের কার্যবিবরণী চেয়ে পাঠিয়েছিলেন। এরপর তৃণমূলকে বলা হয় বৈঠকের মিনিটস ও শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচনের প্রস্তাবের কপি জমা দিতে।
পরে কয়েকজন তৃণমূল বিধায়ক স্পিকারকে জানান, ওই প্রস্তাবে থাকা তাঁদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে স্পিকার তদন্তের নির্দেশ দেন।
এদিকে সন্দীপন সাহার একটি চিঠি স্পিকারের কাছে যায়। যেখানে দাবি করা হয় যে তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন রয়েছে এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
আইনজীবী আরও উল্লেখ করেন, বিরোধী দল নির্বাচন নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও আইন নেই। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, বিধানসভায় সংখ্যায় সবচেয়ে বড় বিরোধী দলকেই বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং তার নেতাই হন বিরোধী দলনেতা। নিয়ে একই দলের ভিতরে এই ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বী দাবি আগে কখনও দেখা যায়নি।
স্পিকার ব্যাখ্যা করেন, তৃণমূলের দুটি চিঠির সঙ্গে বিদ্রোহী বিধায়কদের বহিষ্কারের চিঠিও জমা পড়েছিল। কিন্তু বিদ্রোহী বিধায়করা দাবি করেন, তাঁরা বহিষ্কারের কোনও চিঠিই পাননি। বিদ্রোহীরা স্পিকারকে জানান, তৃণমূলের সংবিধান অনুযায়ী দলীয় নিয়ম ভেঙে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তৃণমূলের সংবিধানে বলা আছে, দলের চেয়ারপার্সনকে বিধায়ক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের মতামত মেনে চলতে হবে।
কবে কোন প্রস্তাব জমা পড়ে
স্পিকার জানিয়েছেন, তাঁর কাছে ৬ মে প্রস্তাব জমা পড়েছিল। ১৯ মে-র কোনও প্রস্তাব জমা পড়েনি। তৃণমূল দাবি করেছিল, ৬ মে নির্বাচিত বিধায়করা সর্বসম্মতভাবে বিরোধী দলনেতা নির্বাচন করেছিলেন। বিদ্রোহীদের দাবি, ১৯ মে বিধায়কদের ডেকে ৬ মে-র তারিখ দেওয়া প্রস্তাবে সই করানো হয়েছিল। আর সেই প্রস্তাবে না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের, না অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতির কোনও উল্লেখ ছিল।
ফের প্রশ্ন বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের?
৯ মে স্পিকার প্রথম চিঠি পাওয়ার পর তা ঝুলিয়ে রাখলেন কেন?
কেন কোনও বৈঠক ডাকলেন না, প্রথম প্রস্তাব নিয়ে কেন কোনও সিদ্ধান্তও নিলেন না?
৩ জুন দ্বিতীয় আবেদন আসার পর, স্পিকার দ্রুত সেটি গ্রহণ করলেন কেন?
প্রথম আবেদন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে স্পিকারের বাধা কোথায় ছিল?
দলের বক্তব্য না শুনে শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে স্পিকার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কি?
প্রথম দাবিকে উপেক্ষা করে দ্বিতীয় দাবিকে গ্রহণ করার কারণ কী? তা হলে দুই পক্ষকে ডেকে সিদ্ধান্ত নিলেন না কেন?
যদি স্পিকার ১ জুন বহিষ্কারের চিঠি পেয়ে থাকেন, তাহলে বহিষ্কৃত ব্যক্তিকেই কীভাবে বিরোধী দলনেতা (LoP) হিসেবে বেছে নিলেন?
আগে তো ৭৮ জনের সমর্থনের দাবি ছিল। সেই দাবির সত্যতা যাচাই করা হল না কেন?
জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়ার পরও অন্য পক্ষকে না শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় কি?
বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, একদিকে জালিয়াতির অভিযোগ ও অন্যদিকে নতুন দাবি- এই পরিস্থিতিতে দুই পক্ষকেই ডেকে শুনানি করা উচিত ছিল। প্রথম প্রস্তাব কেন মানা হল না, সে বিষয়ে যে স্পিকার এখনও কোনও ব্যাখ্যা দেননি, সে কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন বিচারপতি। তিনি বলেন, “স্বাক্ষর জাল কি না, এখনই সেই প্রশ্নে যাচ্ছি না। কিন্তু যিনি প্রথম আবেদন করেছিলেন, তাঁকে শুনানির সুযোগ না দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি মানা জরুরি।” বিচারপতির আরও বক্তব্য, শুধু এফআইআর (FIR) হয়েছে বলেই কাউকে জালিয়াতি করেছে বলা যায় না। স্পিকারের বক্তব্য, “৫৮ জন বিধায়ক শারীরিকভাবে উপস্থিত ছিলেন, তাই আলাদা করে যাচাই করার প্রয়োজন পড়েনি।”


Post A Comment:
0 comments so far,add yours