কেরল সরকারের তথ্য অনুযায়ী, 'ব্রেন ইটিং অ্যামিবা' বা PAM সম্পূর্ণ নার্ভাস সিস্টেমকেই প্রভাবিত করে। এই সংক্রমণে আক্রান্ত হলে, ব্রেন টিস্যু ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফুলে যায় ব্রেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সংক্রমণে মৃত্যু হচ্ছে। অত্যন্ত বিরল এই সংক্রমণ।

আপনার বাড়ির জলে লুকিয়ে নেই তো মস্তিষ্ক-খেকো অ্যামিবা?
ঈপ্সা চ্যাটার্জী


করোনা ভাইরাস, নিপা ভাইরাস- একের পর এক সংক্রমণ। এই সমস্ত সংক্রমণের মধ্যে একটা অদ্ভুত মিল রয়েছে। ভারতে এই সমস্ত সংক্রমণই ছড়িয়েছে কেরল থেকে। এবার প্রশ্ন হল, কেন হঠাৎ কেরলের কথা আসছে কেন? কারণ সেই রাজ্যে আবার ছড়াচ্ছে এক মারণ সংক্রমণ। ভয়ঙ্কর এক প্যাথোজেন খেয়ে নিচ্ছে মস্তিষ্ক। সঠিক সময়ে যদি সংক্রমণ ধরা না পড়ে, তাহলে মৃত্যু নিশ্চিত। কেরলে ইতিমধ্যেই ৬১ জন আক্রান্ত হয়েছেন ‘ব্রেন ইটিং অ্যামিবা’-এ। মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। এরপরই সকলের মনে ভয় তৈরি হয়েছে, এই রাজ্যেও ঢুকে পড়বে না তো এই মারণ প্যাথোজেন?





কীভাবে সংক্রমণ ছড়ায়?
কেরল সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ‘ব্রেন ইটিং অ্যামিবা’ বা PAM সম্পূর্ণ নার্ভাস সিস্টেমকেই প্রভাবিত করে। এই সংক্রমণে আক্রান্ত হলে, ব্রেন টিস্যু ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফুলে যায় ব্রেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সংক্রমণে মৃত্যু হচ্ছে। অত্যন্ত বিরল এই সংক্রমণ।

মূলত উষ্ণ, স্থির থাকা জল থেকেই এই সংক্রমণ ছড়ায়। এই জলেই থাকে ব্রেন ইটিং অ্যামিবা। সংক্রমিত জল পান করলে নয়, বরং এই ধরনের জলে সাঁতার কাটলে বা স্নান করলেই সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি।

মনে করা হচ্ছে, গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে এমন সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জলের তাপমাত্রা বাড়ছে। এই ধরনের প্যাথোজেনও বাড়ছে বা প্যাথোজেন মানুষের সংস্পর্শে আসছে।

এই ধরনের সংক্রমণ মানবদেহ থেকে আরেক মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ে না। অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলেও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

কী কী উপসর্গ রয়েছে? 
ব্রেন ইটিং অ্যামিবা বা প্যাম (PAM) সংক্রমণে মৃত্যুহার খুব বেশি কারণ এটি সহজে চিহ্নিত বা শনাক্ত করা যায় না। এর উপসর্গ মেনিনজাইটিসের মতোই। এই সংক্রমণেও মাথা ব্যথা, জ্বর, বমি ও মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা যায়। যতদিনে এই উপসর্গ দেখে বোঝা যায় যে এটি মেনিনজাইটিস নয়, ততদিনে সেরিব্রাল ইডিমা হয়ে যায়। মস্তিষ্ক ফুলে গেলে বা জল জমে গেলে, তখন রোগীকে রক্ষা করার উপায় থাকে না।

যদি সংক্রমণ অ্যাডভান্সড স্টেজে পৌঁছে যায়, তাহলে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, ভ্রান্তি, বিচার-বুদ্ধির ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, খিঁচুনি, এমনকী রোগী কোমায় পর্যন্ত চলে যেতে পারে।  

এই সংক্রমণ মূলত গ্রীষ্মকালে বা উষ্ণ ঋতুতে হয়। সংক্রমিত হওয়ার ১ থেকে ৯ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তা গুরুতর আকার ধারণ কয়েক ঘণ্টায় বা ১-২ দিনের মধ্যে হতে পারে। এই প্যাথোজেন দ্রুত মস্তিষ্কে পৌঁছে গিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় আক্রমণ করে।

কীভাবে চিকিৎসা সম্ভব?
বিগত ছয় দশক ধরে এই প্যাথোজেনের হদিস মিলেছে। ব্রেন ইটিং অ্যামিবায় আক্রান্ত যারাই প্রাণে বেঁচেছেন, তাদের প্রি-সেরিব্রাল স্টেজেই ধরা পড়েছে সংক্রমণ। তাই চিকিৎসকদের মতে, দ্রুত সংক্রমণ চিহ্নিতকরণ এবং অ্যান্টি-মাইক্রোবায়াল ককটেল প্রাণ বাঁচাতে পারে। এই ককটেল ড্রাগ রক্ত-মস্তিষ্কের প্রাচীর টপকাতে সক্ষম। সিএসএফ টেস্টের মাধ্যমে এই অ্যামিবা শরীরে ঢুকেছে কি না, তা জানা যেতে পারে।

কেরল সরকার ইতিমধ্যেই সতর্কতা জারি করে জানিয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তির মাথা ব্যথা, জ্বর, বমি ও মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা যায় কোনও জলাশয়ে স্নান করার পর, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে।

কেরলে ২০১৬ সালে প্রথম ব্রেন ইটিং অ্যামিবার হদিশ মিলেছিল। ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৮টি কনফার্ম কেসের হদিস মিলেছে। গত বছর হঠাৎ করেই সংক্রমণ বাড়ে। ২০২৪ সালে কেরলে ব্রেন ইটিং অ্যামিবায় আক্রান্ত ৩৬ জনের খোঁজ মিলেছিল। ৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এই বছর সংক্রমণ শুরু হতেই এখনও পর্যন্ত ৬৯ জন আক্রান্তের খোঁজ মিলেছে এবং ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে সংক্রমণের।

সতর্কতা-
কেরল সরকারের তরফে পুকুর বা ঝিলে, যেখানে জল স্থির থাকে, সেখানে স্নান করতে যেতে বারণ করা হয়েছে। যদি কেউ সাঁতার কাটেন, তাহলে নোস ক্লিপ ব্যবহার করতে হবে, যাতে জল নাকে না ঢোকে। কুয়ো এবং জলের ট্যাঙ্ক সঠিকভাবে ক্লোরিন দিয়ে পরিষ্কার করতে বলা হয়েছে। ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের সঙ্গে মিলিতভাবে পরিবেশগত নমুনা সংগ্রহের কাজে নেমেছে সংক্রমণের উৎস খুঁজতে।


কী বলছেন চিকিৎসকরা?
দিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক মণীশা অরোরা বলেছেন, “প্যাম (PAM) বিরল হলেও অত্যন্ত গুরুতর একটি সংক্রমণ“। এনডিটিভি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিএমআরআই কলকাতার নিউরোলজিস্ট ডঃ শুভজিৎ পাল বলেছেন, “ব্রেন ইটিং অ্যামিবা সংক্রমণে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ হল সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়। যেহেতু এটি অত্যন্ত বিরল রোগ, তাই প্রাথমিক উপসর্গগুলি ভাইরাল মেনিনজাইটিসের মতোই থাকে। জ্বর, মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা যায়। রোগী এবং চিকিৎসকরাও বুঝতে পারেন না যে শরীরে মারণ প্যারাসাইট ঢুকেছে। এতে চিকিৎসাতেও দেরি হয়। এই ধরনের সংক্রমণ, যা দ্রুত ছড়ায়, তাতে প্রতি ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ।”
Share To:

kakdwip.com

Post A Comment:

0 comments so far,add yours