বর্তমান সময়ে চারিদিকে যখন ‘ছেলেধরা’ আতঙ্কে সমাজ উত্তাল, ঠিক সেই মুহূর্তেই এক মানবিক ও অভাবনীয় ঘটনার সাক্ষী থাকল দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগর ব্লকের বঙ্কিমনগর গ্রাম। দীর্ঘ ১৫ বছর আগে ঘরছাড়া হওয়া এক বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দিল সাগর থানার পুলিশ ও ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাব (হ্যাম রেডিও)।
গুজব আর সন্দেহের মেঘ কাটিয়ে পনেরো বছর পর মা ও ছেলের পুনর্মিলনে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হলো বঙ্কিমনগরে। গত কয়েকদিন ধরে সাগর থানার অন্তর্গত বঙ্কিমনগর গ্রামে এক অপরিচিত বৃদ্ধাকে ইতস্ততভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রাজ্যে সাম্প্রতিক ‘ছেলেধরা’ গুজবের আবহে অপরিচিত কাউকে দেখলেই যেখানে সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে, সেখানে এই বৃদ্ধার উপস্থিতি চাঞ্চল্য ছড়ায়। স্থানীয়রা তাঁর নাম-পরিচয় জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি সাগর থানায় জানান। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে এবং তাঁর সঠিক পরিচয় জানার চেষ্টা শুরু করে। বৃদ্ধার পরিচয় উদ্ধারে সাগর থানা যোগাযোগ করে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাব’ বা হ্যাম রেডিও-র প্রতিনিধিদের সঙ্গে। হ্যাম রেডিওর পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দিবস মণ্ডল বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলে তাঁর অসংলগ্ন কথাবার্তার সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করেন। আধুনিক প্রযুক্তি ও নিজস্ব নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দ্রুততার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় হুগলি জেলার সিঙ্গুর এলাকায়। সেখান থেকেই উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা যায়, ওই বৃদ্ধার নাম ছবি জ্যোতি (৬৮)।
তিনি প্রায় ১৫ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর মানসিক অবসাদে ঘর ছেড়েছিলেন। হ্যাম রেডিওর সদস্যরা তাঁর ছেলে সুরজিৎ জ্যোতির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি প্রথমে অবাক হয়ে যান। সুরজিৎ জানান, গত ১৫ বছর ধরে তাঁরা মাকে হন্যে হয়ে খুঁজেছেন। এমনকি বছর দুয়েক আগে একবার খবর পেয়েও সেখানে গিয়ে মাকে খুঁজে পাননি। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, মায়ের খোঁজ পাওয়ার পর দীর্ঘ তিন দিন কেটে গেলেও সুরজিৎ তাঁকে নিতে আসার ব্যাপারে নানা টালবাহানা শুরু করেন। বিষয়টি স্থানীয় পঞ্চায়েত, বিডিও অফিস এমনকি সিঙ্গুর থানাতেও জানানো হয়।
ছেলের এই গড়িমসি দেখে পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুভব করেন হ্যাম রেডিও প্রতিনিধি দিবস মণ্ডল। তিনি সরাসরি যোগাযোগ করেন রাজ্য পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিকের সঙ্গে। পুলিশের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ এবং হ্যাম রেডিওর লাগাতার চাপের মুখে অবশেষে সুরজিৎ জ্যোতি সাগর থানায় পৌঁছাতে বাধ্য হন। সোমবার যখন সাগর থানায় পনেরো বছর পর মা ও ছেলে মুখোমুখি হন, তখন উপস্থিত পুলিশ কর্মী ও সাধারণ মানুষের চোখেও জল চলে আসে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ভবঘুরে জীবন কাটানো ছবি দেবী তাঁর সন্তানকে চিনতে পারেন। অন্যদিকে, মাকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সুরজিৎ-ও। তিনি স্বীকার করেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মাকে ফিরে পাওয়া তাঁর কাছে এক অলৌকিক ঘটনার মতো। এই মানবিক মিশনের সফল রূপায়ণের জন্য সাগরের এসডিপিও সাগর থানার ওসি এবং বিশেষ করে হ্যাম রেডিও-র প্রতিনিধিদের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ছবি দেবীর পরিবার ও বঙ্কিমনগরের বাসিন্দারা। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গুজবে কান না দিয়ে সাধারণ মানুষ যদি এভাবেই সচেতনতার পরিচয় দেন, তবে অসহায় মানুষদের সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব। এই ঘটনা প্রমাণ করল যে, প্রযুক্তির সাথে যদি মানবিকতার মেলবন্ধন ঘটে, তবে পনেরো বছরের হারানো সম্পর্ককেও আবার জোড়া লাগানো সম্ভব।


Post A Comment:
0 comments so far,add yours