বুধবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বিআর গবাই এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চে উঠেছিল এই ট্রাইবুনাল রিফর্ম মামলা। মূলত একটি ট্রাইবুনালে সদস্য নিয়োগ ও তাঁর কার্যকালের মেয়াদ প্রসঙ্গে শুনানি শুরু হয় প্রধান বিচারপতি গবাই নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে। বারংবার বারণ করা সত্ত্বেও কেন কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে অগ্রাহ্য করেছে বলে প্রশ্ন করে শীর্ষ আদালত।
মোদী সরকারের আইন বাতিল করল সুপ্রিম কোর্ট, কেন?
প্রতীকী ছবি
অবসরগ্রহণের দিন চারেক আগে ঐতিহাসিক রায় দিলেন শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি বিআর গবাই। বাতিল করে দিলেন ট্রাইবুনাল রিফর্ম অ্যাক্ট। পাশ হওয়ার মাত্র চার বছরের মাথায় বাতিল হয়ে গেল এই আইন। পাশাপাশি, এটিকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে কটাক্ষ করলেন প্রধান বিচারপতি বিআর গবাই।। কিন্তু এই শীর্ষ আদালতের এই রায়ের অর্থ কী? কেনই বা বাতিলের মতো পরিস্থিতি তৈরি হল?
বুধবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বিআর গবাই এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চে উঠেছিল এই ট্রাইবুনাল রিফর্ম মামলা। মূলত একটি ট্রাইবুনালে সদস্য নিয়োগ ও তাঁর কার্যকালের মেয়াদ প্রসঙ্গে শুনানি শুরু হয় প্রধান বিচারপতি গবাই নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে। বারংবার বারণ করা সত্ত্বেও কেন কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে অগ্রাহ্য করেছে বলে প্রশ্ন করে শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, ‘আমরা ট্রাইবুনাল রিফর্ম অধ্যাদেশ এবং ট্রাইবুনাল রিফর্ম আইন, এই দুইকেই পাশাপাশি রেখে তুলনা করেছি। তারপর এটা স্পষ্ট যে এর আগে অধ্যাদেশের অন্তর্গত যে যে বিধানগুলিকে আদালত বাতিল করেছিল, সেগুলিকেই নতুন রূপে রিফর্ম আইনে তুলে ধরা হয়েছে।’
বর্তমানে দেশে মোট ১৯টি ট্রাইবুনাল রয়েছে। এটি একটি কোয়াশি-জুডিসিয়াল বডি বা আধা-বিচার সংস্থা, যা মূলত আদালতের বিকল্প হিসাবে কাজ করে থাকে। নির্দিষ্ট কোনও ইস্যুর ভিত্তিতে থাকে নির্দিষ্ট ট্রাইবুনাল। যেমন, পরিবেশগত কোনও সমস্যা, তার জন্য মামলাকারী দ্বারস্থ হতে পারেন ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনাল বা জাতীয় পরিবেশ আদালতে।
বিতর্কের সূচনা
২০২১ সালে একটি অধ্য়াদেশ পাশ করায় কেন্দ্রীয় সরকার। নাম ট্রাইবুনাল সংস্কার অধ্যাদেশ। কিন্তু অধ্যাদেশের বেশ কয়েকটি বিধান নিয়ে তৈরি হয়েছিল বিতর্ক। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ট্রাইবুনালের সভাপতি ও অন্য সদস্যদের ন্যূনতম ৫০ বছর বয়স হতে হবে। যা শীর্ষ আদালতের চোখে ‘বৈষম্য়মূলক’ ছিল। আদালত বলেছিল, এই বিধান বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। নতুনদের পরখ করারও জায়গা করে দিচ্ছে না।
দ্বিতীয় বিতর্ক ছিল ট্রাইবুনালের সভাপতি ও সদস্যদের মেয়াদকাল নিয়ে। অধ্য়াদেশের ধারা ১২-তে বলা হয়েছিল, নিযুক্তদের কার্যকালের মেয়াদ হবে মাত্র চার বছর। তবে এই সিদ্ধান্তকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে কেন্দ্রকে ভর্ৎসনা করেছিল শীর্ষ আদালত। পরিবর্তে পাঁচ বছরের মেয়াদকালের নির্দেশ দিয়েছিল শীর্ষ আদালত।
তৃতীয় বিতর্ক, যা আসলেই এই অধ্যাদেশের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ। তা হল ট্রাইবুনালের নিয়োগ প্রক্রিয়া। একটি ট্রাইবুনালের সভাপতি ও সদস্য নিয়োগের জন্য একুশ সালের অধ্যাদেশের মাধ্য়মে একটি সিলেকশন কমিটি তৈরি করে কেন্দ্রীয় সরকার। দেশের প্রধান বিচারপতি, দু’জন সচিব, একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও ট্রাইবুনাল দফতরের এক আমলাকে নিয়ে তৈরি হয় এই কমিটি। কিন্তু অভিযোগ ওঠে এই কমিটি পক্ষান্তরে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতেই ট্রাইবুনাল-নিয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা তুলে দিচ্ছে। যে কারণে অধ্যাদেশের অন্তর্গত এই বিধানকেও খারিজ করে শীর্ষ আদালত।
নতুন আইন কী বলছে?
অধ্যাদেশ বাতিল! তবে ট্রাইবুনাল নয়। ২০২১ সালে ১৩ই অগস্ট, ট্রাইবুনাল সংস্কারে নতুন বিল পাশ করে কেন্দ্রীয় সরকার। নাম ট্রাইবুনাল রিফর্ম অ্যাক্ট, ২০২১। সম্প্রতি শীর্ষ আদালতে এই আইনের বিরোধিতায় একটি মামলা দায়ের করেন কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ এবং মাদ্রাজ বার অ্যাসোসিয়েশন। এই আইনকে একুশ সালে বাতিল হওয়া অধ্য়াদেশেরই ‘ছদ্মবেশ’ বলে দাবি করে তারা। পাশাপাশি, এই আইন বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে বলেও অভিযোগ বার অ্যাসোসিয়েশনের। এরপর মামলার পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হয় শুনানি। বুধবারের শুনানি পর্বের শেষে রায়দান করে শীর্ষ আদালত।
ট্রাইবুনাল রিফর্ম আইনের একাধিক বিধান বাতিল করল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ। নতুন মোড়কে বিতর্কিত বিধানগুলিকেই টেনে আনা হয়েছে বলেও কেন্দ্রকে ভর্ৎসনা করে শীর্ষ আদালত।
প্রধান বিচারপতি বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, ‘এর আগেও এই বিধানগুলিকে ত্রুটিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছিল শীর্ষ আদালত। কিন্তু তারপরেও কেন এগুলিকেই নতুন রূপে নিয়ে আসা হল? এটা কি বিচারবিভাগীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা নয়? সংসদের কি তা করার ক্ষমতা রয়েছে?’ শুধু তা-ই নয়, অধ্যাদেশ বাতিলের পর্বে একটি জাতীয় ট্রাইবুনাল কমিশন তৈরির নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। বুধবারের শুনানি পর্বেও ওঠে সেই প্রসঙ্গ। বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, ‘এই মুহুর্তে একটি ট্রাইবুনাল কমিশন গঠন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটা কাজ। নিদেনপক্ষে দেশের ট্রাইবুনালগুলির স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা এবং অভিন্নতাকে এই কমিশনই সুনিশ্চিত করতে পারবে।’


Post A Comment:
0 comments so far,add yours