একটা প্রশ্ন উঠে আসে বারবার। বাস্তবে যে Gen Z-এর বিচরণ সর্বদা অতিক্ষীণ বলে বদনাম রয়েছে, সে কী করে রাস্তায় নেমে এসে সক্রিয় আন্দোলন করছে? একই সঙ্গে কী ভাবে এই দুই বিপরীত ধর্মী স্বত্তাকে বহন করে নিয়ে চলেছে Gen Z? সমাজমাধ্যমে বিপ্লবের সঙ্গেই কীভাবে অনায়াসে সামিল হচ্ছে প্রতিবাদে, ডরাচ্ছে না বন্দুকের নলকে, একে অপরকে না চিনেও কী ভাবে গর্জে উঠছে রাষ্ট্রের মনমর্জি, সামাজিক অবক্ষয় এবং দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার বিরুদ্ধে?
“আঠারা বছর বয়স কী দুঃসহ, স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি…আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়, পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা…” কবি সুকান্তের কবিতার এই দুটি লাইন যথেষ্ট দেশের তরুণদের ক্ষমতা ব্যাখ্যা করতে। তবু এই যুগটা যেন খানিকটা আলাদা। বর্তমানের আঠারোদের দিকে বা আরও ভাল ভাবে বললে Gen Z-এর দিকে বারবার উঠেছে আঙুল। তাঁরা নাকি সারাদিন বুঁদ হয়ে থাকে সমাজমাধ্যমে। বাস্তব সম্পর্কে উদাসীন, আত্মকেন্দ্রীক। অথচ কি অদ্ভুত দেখুন, গত কয়েক বছরে এই ‘আঠারো’ই ভেঙে চুরমার করেছে ঘুণ ধরা রাষ্ট্র ব্যবস্থা। ২০২২ শ্রীলঙ্কা, ২০২৪ বাংলাদেশ আর দু’দিন আগে নেপাল। ‘আঠারো’র হাত ধরে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, নিরাপত্তার বেড়াজাল টপকে টেনে হিঁচড়ে জনবিরোধী সরকারকে নামিয়ে এনেছে রাস্তায়।
স্বভাবতই একটা প্রশ্ন উঠে আসে বারবার। বাস্তবে যে Gen Z-এর বিচরণ সর্বদা অতিক্ষীণ বলে বদনাম রয়েছে, সে কী করে রাস্তায় নেমে এসে সক্রিয় আন্দোলন করছে? একই সঙ্গে কী ভাবে এই দুই বিপরীত ধর্মী স্বত্তাকে বহন করে নিয়ে চলেছে Gen Z? সমাজমাধ্যমে বিপ্লবের সঙ্গেই কীভাবে অনায়াসে সামিল হচ্ছে প্রতিবাদে, ডরাচ্ছে না বন্দুকের নলকে, একে অপরকে না চিনেও কী ভাবে গর্জে উঠছে রাষ্ট্রের মনমর্জি, সামাজিক অবক্ষয় এবং দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার বিরুদ্ধে? এই প্রতিবেদন এখন লিখতে বসার কারণ নতুন করে বলে দিতে হয় না।
এটিও পড়ুন
Nepal Gen Z Protest: নেপালে গণ অভ্যুত্থানের পিছনে আসলে কার হাত?
বাংলায় এই প্রথমবার দেখতে পারবেন The Bengal Files, উইকেন্ডেই রয়েছে শো
Nepal Unrest: ‘পুজোয় মনে হয় আর ওদের আসা হবে না’, নেপালের অবস্থা দেখে ঘুম উড়ছে বাঁকুড়ার লালবাজারের
কিছুদিন আগে নেপালের সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছিল সরকারের চোখ এড়িয়ে অবাঞ্ছিত বিষয়বস্তুর রমরমা বাড়ছে সমাজমাধ্যমে। তাই সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল সে দেশে ব্যবসা করার আগে দেশি-বিদেশি সব ধরনের প্ল্যাটফর্মকে যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকে নথিভুক্ত হতে হবে। তার জন্য ৭ দিনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, এক্স, লিঙ্কডইন, রেডিট, হোয়াটসঅ্যাপ এবং স্ন্যাপচ্যাট-সহ ২৬টি সমাজমাধ্যম তা না করতে পারায় বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল কেপি শর্মা ওলির সরকার। তারপর থেকেই বাড়তে থাকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দ্বেষ। আরও ভাল ভাবে বললে Gen Z-এর মধ্যে বেড়েছে অসন্তোষ। যে অসন্তোষ ক্রমে দাবানলে পরিণত হয়ে গ্রাস করেছে গোটা সরকারকে।
কিন্তু প্রশ্ন হল শুধুমাত্র কিছু সমাজমাধ্যম নিষিদ্ধ করতেই কেন পথে নেমে এলে Gen Z? এই প্রতিবেদন যখন লিখছি চ্যানেলের শিরোনাম বলছে সেনা-আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে এখনও অবধি প্রাণ হারিয়েছেন ২১ জন। খানিকটা বাংলাদেশের মতোই পদ থেকে ইস্তফা দিতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেখানো হচ্ছে তিনি নাকি নিজের ক্যাবিনেটকে নিয়ে হেলিকপ্টারে করে নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়েছেন। আন্দোলনকারীরা তছনছ করে দিয়েছে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী প্রচণ্ডর বাসভবন। জ্বলছে সংসব ভবন। মন্ত্রীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চালিয়েছে হামলা। অর্থমন্ত্রী-বিদেশমন্ত্রীকে রাস্তায় ফেলে মেরেছে লাথি, চড়। এই সব কিছুই হয়েছে ২৬টা সমাজমাধ্যম ব্যান করে দেওয়ার পরেই। স্বভাবতই আঙুল উঠছে Gen Z-এর দিকে। কেন এতটা ভার্চুয়াল জগত নির্ভর একটা প্রজন্ম? মাত্র ৪-৫ বছর আগেও যখন কোভিড হয়েছিল মানুষ হাহুতাশ করছিল লকডাউনের কারণে। তাহলে এই প্রজন্মের কাছে কেন সমাজমাধ্যম জীবন-মরণ সমস্যার সমান? কী ভাবে এতটা হিংস্র হয়ে উঠল Gen Z?
সমাজমাধ্যম এবং Gen Z –
সমাজমাধ্যম আজ Gen Z-এর কাছে আত্মপরিচয়ের মানদন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সেটা না থাকা মানে কেবল আত্মপরিচয়ের অভাবের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। যত সময় যাচ্ছে মানুষ যেন বড় একা হয়ে যাচ্ছে। সমাজের এই ট্রেন্ডই তাঁদের ঠেলে দিয়েছে আরও একাকিত্বের দিকে। যা তাঁদের করে তুলেছে আত্মকেন্দ্রীক। মনোবিদ সমাদৃতা ভট্টাচার্য্য মনে করেন, “Gen Z-এর কাছে সোশ্যাল মিডিয়া কেবল আইডেন্টিটি ক্রাইসিস নয়, আইডেন্টিটি ভ্যালিডেশনের খুব বড় অংশ হয়ে গেছে। বাস্তবের মাটিতে মানুষ যত একা হচ্ছে, মানুষ তত বেশি করে সমাজমাধ্যম নির্ভর হচ্ছে। সমাজমাধ্যমে আমরা ততটুকু দেখতে পাই যতটা কেউ দেখাতে চাইছেন।এখানে নিজের সঙ্গী পাওয়া অনেক বেশি সহজ। সেখান থেকে লাইক পাওয়াটা অনেক বেশি সোজা। আমরা শুধু সেইটুকু হাইলাইট করি যেটুকু দিয়ে অন্যকে সহজে আকৃষ্ট করা যায়।”
সহজ ভাবে বললে সমাজমাধ্যম আমাদের সেই কল্পনার জগতে বিচরণের অনুভূতি এবং সুখ দেয় দেয় যা আমরা মনে মনে আমাদের জন্য কল্পনা করি। যা হয়তো বাস্তবের মাটিতে পাওয়া শক্ত বা কখনও কখনও অসম্ভব। অনেকে বাস্তব জগতের সমস্যাগুলি থেকে ক্ষণিকের শান্তি খুঁজতেও ছুটে আসেন সমাজমাধ্যমে। আসলে আমাদের আত্মবিশ্বাস এবং মনের রসদ এতই কমে যাচ্ছে যে আত্মতুষ্টির জন্য বাহ্যিক মান্যতার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সমাদৃতা বলছেন, “আমি আমার পেশেন্ট এবং অনান্য বাচ্চাদের মধ্যেও দেখেছি হয়তো আমার খুব বোর লাগছে বা মন খারাপ। আমি সোশ্যাল মিডিয়াতে এমন এক জগতে পৌঁছে যাচ্ছি যেখানে ভার্চুয়ালি আমার সব চাওয়া পূরণ হচ্ছে খুব সহজে।”
অনেক ক্ষেত্রে Gen Z-এর কাছে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের বড় মাধ্যম সোশ্যাল মিডিয়া। এমনও দেখা যায়, যার সঙ্গে বাস্তবে কেউ কথা বলে না, তাঁকে হয়তো কেউ সোশ্যাল মিডিয়াতে খারাপ কথাও বলছে, কিন্তু তাতেও তার একটা কথা বলার জায়গা তৈরি হচ্ছে। তাই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যান করে দেওয়াটা Gen Z কাছে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে নির্জন দ্বীপে একলা ছেড়ে দেওয়ার মতোই নিঃসঙ্গ এবং ভয়ের। মনোবিদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সর্বক্ষণ ভ্যালিডেশনের মধ্যে নিজের আমিত্বকে খুঁজে পাওয়া এবং নিঃসঙ্গতা, এই দুই Gen Z-কে ঠেলে দিচ্ছে মারাত্মক সংগ্রামের দিকে। যা তাঁদের কাছে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম বলেই তাঁদের ধারণা।
মনোবিজ্ঞান বলে, ধরুন আপনার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা যেটার সঙ্গে আপনার আত্মস্লাঘা জড়িত, তা যদি কেউ কেড়ে নিতে চায় তাহলে মানুষ এতটাই হিংস্র হয়ে ওঠে। সেটাই প্রত্যেকের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। মনোবিদের মতে, “সোশ্যালমিডিয়াগুলি ব্যান করে দেওয়া ওঁদের কাছে বাক স্বাধীনতা হরণের সমান। ঠিক যে মানসিক স্থিতি থেকে একদিন মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিল, ওঁরাও অনেকটা একই রকম ভাবে ভাবছে।”
পেটের দায় –
আরেকটি বিষয় এড়িয়ে গেলে চলবে না। তা হল নেপালের ভৌগোলিক এবং আর্থসামাজিক পরিস্থিতি। নেপাল এমন একটি দেশ, যেখানে বড় অংশের মানুষের জীবিকা পর্যটন ভিত্তিক। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে পর্যটন ব্যবসার অন্যতম মূল মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে সমাজমাধ্যম। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে প্রচার, হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ— পেশাদার দুনিয়ার অংশ হয়ে উঠেছে এই সব সমাজমাধ্যম। এই সব নিষিদ্ধ হয়ে গেলে স্বাভাবিক ভাবে প্রভাব পড়বে জীবিকাতেও।
বর্তমানে অনেকের একমাত্র জীবিকাও সোশ্যালমিডিয়া। Gen Z-এর একটা বড় অংশ এই সমাজমাধ্যমগুলি থেকেই আয় করেন। সুতরাং এগুলিকে ব্যান করে দেওয়ার অর্থ কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাওয়া। পেটের টান একটা বড় কারণ হতে পারে।
মৌলিক স্বাধীনতা –
সমাদৃতা বলছেন, “আমি আমার জীবন কীভাবে কাটাতে চাই তা সম্পূর্ণ রূপে আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। সেটা বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা মারব নাকি সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকব আমার ইচ্ছা। সেখানে কেউ হস্তক্ষেপ করলে নিজের অধিকার বোধ থেকেও একটা প্রতিরোধ তৈরি হয়। আমাদের ব্রেন বিষয়টাকে বিপদ হিসাবে চিহ্নিত করে।”
কুপ্রভাব কী নেই?
আছে, এর ফলে Gen Z কে বাস্তবের জগতে বারবার সমস্যার মুখে পড়তে হয়। বাস্তব পরিস্থিতির মতো করে রিয়্যাক্ট করার দাবি রাখে। কিন্তু Gen Z সেই কঠিন সত্যি মেনে নিতে পারে না। ফলসরূপ এঁদের মধ্যে বাড়ছে অ্যাডজাস্টমেন্টের সমস্যা, অবসাদের মতো ঘটনা। এমনকি তাঁর প্রভাব পড়ছে রিলেশনশিপেও। তৈরি হচ্ছে জটিলতা। Gen Z বাস্তবে সম্পর্কে গড়তে এবং তাকে টিকিয়ে রাখতে যা করা প্রয়োজন সেটা করে উঠতে পারছে না।
মনোবিদ বলছেন, “এই হিংস্রতার নেপথ্যে আরও একটি বিষয় আছে। বর্তমানে নিজে মরা এবং অন্যকে মারা এই দুটি অত্যন্ত গ্লোরিফায়েড। আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে একজনকে মেরে ফেলাটা খুব সাধারণ হয়ে গেছে। মানুষের মধ্যে কমে এসেছে ধৈর্য্য।” সমাদৃতার মতে, “এই বিষয়টিকে কেবলমাত্র Gen Z দিক থেকে দেখলে খুব ভুল হবে। এটিকে সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক মানসিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বিচার করতে হবে। আজকের এই পরিস্থিতির জন্য বদলে যাওয়া সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত দায়ী।”
নেপথ্য রহস্য –
সমাদৃতা যে খুব একটা ভুল নয় তা বোধহয় বোঝা যায় একটু ভাল করে এই আন্দোলনকারীদের দিকে কান পাতলে। এই আন্দোলনকে কেবলমাত্র সোশ্যাল মিডিয়া ব্যানের প্রভাব বললে মিথ্যাচার করা হয়। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য সারা বিশ্ব জুড়ে নানা কৌশলে একটা চেষ্টা চলছে দেশের তরুণ বিক্ষুব্ধদের এই আন্দোলনকে কেবল সমাজমাধ্যম ব্যানের মতো একটি বিষয়ে আটকে রাখার। যেন আন্দোলনকারীরা ‘লঘু পাপে গুরু দন্ড’ দিয়েছে সরকারকে। কিন্তু আসলে তা নয়। বরং এটিকে কফিনের শেষ পেরেকটা বলা চলে মাত্র। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাবানদের র্নীতি, স্বজনপোষণ, আর্থিক বৈষম্যের মতো বিষয়ে ছাই চাপা আগুনটা ছিলই।
এই কথা বলছি কারণ ওলি সরকার উৎখাতে খান্ত হয়নি আন্দোলন। দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের দাবিও তুলেছেন বিক্ষোভকারীরা। পাশাপাশি, গত তিন দশক ধরে রাজনৈতিক নেতাদের করা লুটের তদন্তের দাবিও তোলা হয়েছে। বেকারত্ব মোকাবিলা, অভিবাসন কমানো এবং সামাজিক অবিচার মোকাবিলায় বিশেষ কর্মসূচি চালু করারও ডাক দিয়েছেন নেপালের ছাত্র-যুব সমাজ। দাবি উঠেছে সংবিধান সংশোধন করার বা সম্পূর্ণ পুনর্লিখনের।
বর্তমানে নেপালের দায়িত্ব নিয়েছে সে দেশের সেনাবাহিনী। জারি হয়েছে কার্ফু। বুধবার থেকে বড় কোনও অশান্তির খবর না এলেও হয়েছে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ। চলছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তুতি।
বিক্ষোভকারীরা বলেছেন, “এই আন্দোলন কোনও দল বা ব্যক্তির জন্য নয়। নেপালের সব প্রজন্মের মানুষ এবং দেশের ভবিষ্যতের জন্য। শান্তি প্রতিষ্ঠা হওয়া দরকার। তবে তা কেবল একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করেই সম্ভব।” সেটা হবে নাকি বাড়বে বিশৃঙ্খলা, বলবে সময়!


Post A Comment:
0 comments so far,add yours