একদিকে যখন গঙ্গাসাগর মেলায় দেশ-বিদেশের মানুষের ভিড়, ঠিক তখনই দক্ষিণ ২৪ পরগনার উপকূলীয় গ্রাম ফ্রেজারগঞ্জের পশ্চিম অমরাবতীতে দেখা গেল এক ভিন্ন ছবি। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে যাঁদের নিত্য লড়াই, সেই মৎস্যজীবী পরিবারের মানুষজন মেতে উঠেছেন তাঁদের প্রাণের উৎসবে। পশ্চিম অমরাবতী গ্রামের ঐতিহ্যবাহী গঙ্গা মেলা ও পূজা এবার ৯১ বছরে পদার্পণ করল।
এই এলাকার সিংহভাগ মানুষের জীবিকা সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। কেবল পুরুষরাই নন, মহিলারাও সমানভাবে শুঁটকি মাছের খুঁটি সামলানো এবং মাছ শুকানোর কাজের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া এই মানুষগুলোর জীবন সবসময়ই অনিশ্চয়তার সুতোয় ঝোলে। অতীতে বহুবার ঘূর্ণিঝড় আর উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে এই গ্রামের মৎস্যজীবীরা প্রাণ হারিয়েছেন। সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁদের বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে যে, একমাত্র ‘গঙ্গা মা’-ই পারেন তাঁদের বিপদ থেকে রক্ষা করতে।
আজ থেকে ৯১ বছর আগে শুরু হয়েছিল এই আরাধনা। মকর সংক্রান্তির পুণ্যতিথিতে শুরু হওয়া এই পূজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং মৎস্যজীবীদের রুটি-রুজি আর নিরাপত্তার প্রার্থনায় পরিণত হয়েছে। পূজা কমিটির সম্পাদক ব্যাসদেব বাগানি বলেন, “আমাদের এই এলাকায় প্রায় সকলেই নদীর ওপর নির্ভরশীল। মাছ ও কাঁকড়া ধরেই আমাদের জীবনযাত্রা চলে। প্রতি বছরই মকর সংক্রান্তিতে আমরা এই গঙ্গা পূজা করি। মায়ের আরাধনা সেরেই আমরা নতুন উদ্যমে উত্তাল সমুদ্রে মাছের সন্ধানে পাড়ি দিই। এই বিশ্বাসই আমাদের সাহস জোগায়।
মেলার পরিবেশ জুড়ে যেমন উৎসবের মেজাজ রয়েছে, তেমনই জড়িয়ে আছে মৎস্যজীবী পরিবারের কঠোর পরিশ্রমের গল্প। গ্রামের মহিলারা জানান, বছরের অনেকটা সময় তাঁদের বাড়ির পুরুষরা সমুদ্রে থাকেন। সেই সময় মায়েরা এই গঙ্গা পূজায় ব্রতী হন যাতে তাঁদের প্রিয়জনরা ঝোড়ো সমুদ্র থেকে সুস্থ শরীরে প্রচুর মাছ নিয়ে ফিরে আসতে পারেন। ৯১ বছর ধরে চলে আসা এই মেলা আজ কেবল পশ্চিম অমরাবতী নয়, সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলের এক অন্যতম সামাজিক মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।


Post A Comment:
0 comments so far,add yours