আর কয়েকদিন পরই স্কুল সার্ভিস কমিশনের লিখিত পরীক্ষায় বসবেন চাকরিপ্রার্থীরা। জানা গিয়েছে, অনেক পরীক্ষার্থীর অ্যাডমিট কার্ডেই ছবি ও সই নেই। কী হবে এই পরিস্থিতিতে? কী বলছে স্কুল সার্ভিস কমিশন? কী বলছে বিরোধীরা? পড়ুন টিভি৯ বাংলার বিশেষ প্রতিবেদন...

ছবিহীন অ্যাডমিট কার্ড, পরীক্ষা বাতিল হবে?
কী বলছে স্কুল সার্ভিস কমিশন?

এপ্রিলের ৩ তারিখ। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০১৬ সালের এসএসসি-র পুরো প্যানেল বাতিল হয়ে যায়। চাকরি হারান প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী। আবার শীর্ষ আদালতের নির্দেশেই ফের পরীক্ষা নিচ্ছে স্কুল সার্ভিস কমিশন। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সেই অঙ্ক কষেই পদক্ষেপ করেছে এসএসসি। লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হবে দু’দিন। নবম-দশমের চাকরিপ্রার্থীরা পরীক্ষা দেবেন আগামী ৭ সেপ্টেম্বর। আর একাদশ-দ্বাদশের জন্য চাকরিপ্রার্থীদের পরীক্ষা ১৪ সেপ্টেম্বর। ফলে লিখিত পরীক্ষার জন্য হাতে গোনা আর কয়েকটা দিন বাকি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে নতুন করে আবেদনের পোর্টালও খোলা হয়েছিল। সোমবার পর্যন্ত সেখানে আবেদন জমা পড়েছে। এরপরই স্কুল সার্ভিস কমিশনের নতুন একটি নির্দেশ ঘিরে জলঘোলা শুরু হয়েছে। কী সেই নির্দেশ? এসএসসি জানিয়েছে, পরীক্ষার দিন প্রত্যেক চাকরিপ্রার্থীকে অ্যাডমিট কার্ড ছাড়াও ভোটার কিংবা আধার কার্ড সঙ্গে আনতে হবে। কিন্তু, হঠাৎ করে এই নির্দেশ কেন দিতে গেল স্কুল সার্ভিস কমিশন? আর সেই নির্দেশ ঘিরে বিতর্কই বা কেন?


চাকরিপ্রার্থীদের জন্য স্কুল সার্ভিস কমিশনের নতুন নির্দেশ-



হঠাৎ কেন এমন নির্দেশ দিল এসএসসি?

স্কুল সার্ভিস কমিশন জানিয়েছে, পরীক্ষায় বসার জন্য অনলাইনে আবেদন করার সময় অনেক চাকরিপ্রার্থীই ঠিকমতো ছবি ও সই আপলোড করেননি। যে ফরম্যাটে ছবি চাওয়া হয়েছিল, সেই ফরম্যাটে ছবি পাঠাননি অনেকে। আর অ্যাডমিট কার্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপলোড হয়। তাই, সঠিক ফরম্যাটে যেসব আবেদনকারী ছবি আপলোড করেননি, তাঁদের অ্যাডমিট কার্ডে ছবি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এই নিয়ে কমিশনের তরফে বারবার চাকরিপ্রার্থীদের আবেদন করা হয়েছিল। তারপরও অনেক চাকরিপ্রার্থীই সঠিক ফরম্যাটে ছবি আপলোড করতে পারেননি। তাই, চূড়ান্ত বিকল্প হিসেবে প্রত্যেক চাকরিপ্রার্থীকে আধার কিংবা ভোটার কার্ড আনতে বলা হয়েছে। যাতে পরীক্ষার আগে চাকরিপ্রার্থীদের চিহ্নিত করা যায়। তবে অ্যাডমিট কার্ডে ছবি না থাকলেও যে চাকরিপ্রার্থীদের চিন্তার কিছু নেই, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে স্কুল সার্ভিস কমিশন।

যাঁরা ঠিকমতো ফরম্যাটে ছবি পাঠাননি, তাঁদের কেন আবেদনপত্র বাতিল হল না?

একজন চাকরিপ্রার্থীকে আবেদনপত্রের সঙ্গে ছবিও আপলোড করতে হয়। এটা বাধ্যতামূলক। এসএসসি-র তরফে জানা গিয়েছে, ২০১৬ সালে যে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল, তাতে সব অ্যাডমিট কার্ডে ছবি ছিল। এবারও আবেদনকারীরা আবেদনপত্রের সঙ্গে ছবি আপলোড করেছেন। কিন্তু, যে ফরম্যাটে ছবি আপলোড করতে বলা হয়েছিল, তা অনেকে করেননি। এসএসসি সূত্রে জানা গিয়েছে, সেইমতো আবেদনপত্র বাতিল হলে বহু চাকরিপ্রার্থীর আবেদনই বাতিল হয়ে যেত। আবার সুপ্রিম কোর্ট প্রত্যেক যোগ্য চাকরিহারা শিক্ষককে পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। ফলে সঠিক ফরম্যাটে ছবি আপলোড না হওয়ার জন্য আবেদনপত্র বাতিল হলে অনেক যোগ্য চাকরিহারা শিক্ষকও হয়তো বাদ পড়তেন। তাতে নতুন করে বিতর্ক বাধত। তাঁদের সুযোগ দিতে গিয়েই নতুন আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেও ছবি সঠিক ফরম্যাটে আপলোড না হলেও পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। কারণ, একই যাত্রায় পৃথক ফল হতে পারে না।

এসএসসি-র আধিকারিকরা বলছেন, নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির জন্য ৫ লক্ষের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। আবার আদালতের নির্দেশে পরীক্ষায় বসার আবেদন গ্রহণের জন্য ফের আবেদনের পোর্টাল খোলা হয়েছিল। এত কম সময়ে ম্যানুয়ালি অ্যাডমিট কার্ডের বিষয়টি দেখা সম্ভব নয়। ফলে ফরম্যাট মেনে ছবি না পাঠালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাডমিট কার্ড তৈরির ক্ষেত্রে সেই ছবি অ্যাডমিট কার্ডে থাকবে না। সেজন্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে প্রত্যেক চাকরিপ্রার্থীকে আধার কিংবা ভোটার কার্ড আনতে বলা হয়েছে। যাতে পরীক্ষার্থীর পরিচয় যাচাই করা যায়।

অ্যাডমিট কার্ডে ছবি না থাকা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন-

স্কুল সার্ভিস কমিশনের এই পদক্ষেপ নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন উঠছে। ভোটার কার্ড কিংবা আধার কার্ড অনেকদিনের পুরনো হলে চাকরিপ্রার্থীর বর্তমান মুখের সঙ্গে মিল নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে কী হবে, সেই প্রশ্ন উঠছে। প্রশ্ন তুলেছেন স্কুল সার্ভিস কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান চিত্তরঞ্জন মণ্ডল। তিনি বলেন, “চাকরিপ্রার্থীকে চিহ্নিত করতে যদি ছবির প্রয়োজন হয়, তবে তা সাম্প্রতিক ছবি হতে হয়। এটাই নিয়ম। আধার-ভোটার কার্ড তো কেউ গতকাল করেননি। অনেকদিন আগে করেছেন। সেক্ষেত্রে তাঁর মুখের আদলের পরিবর্তন হবে। আধার কার্ডের ছবি তোলার পর সেটা প্রিন্ট করার সময় একটু পরিবর্তন হয়। অনেকদিন হয়ে গেলে আরও সমস্যা হয় সেই ছবি দেখে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে। ফলে অনেক সমস্যা হবে। হয়তো সেই সমস্যা জিইয়ে রাখতেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে আমি মনে করি।”

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় রাজ্যের বিরুদ্ধে লাগাতার সরব হন আইনজীবী ফিরদৌস শামিম। তাঁর বক্তব্য, দুর্নীতির জন্য ক্রটি রাখা হচ্ছে। কী বলছেন তিনি? শামিমের বক্তব্য, “এই যে ছবি-সই নেই, এরকম বিভিন্ন পদ্ধতিগত ত্রুটি রাখা হচ্ছে। একজনের পরীক্ষা অন্যজন দিয়ে চলে আসবে। আসলে এটা করাই হচ্ছে পদ্ধতিটিকে ত্রুটিযুক্ত ও দুর্নীতি করার জন্য।” দুর্নীতি হলে ফের আদালত হস্তক্ষেপ করবেন জানিয়ে তিনি বলেন, “দুর্নীতি করলে তো আদালত হস্তক্ষেপ করবেই। আর ভবিষ্যতে যদি দুর্নীতি হয়, তাহলে সমস্যা হবে। দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার তো দুর্নীতিগ্রস্ত কাজকর্মই করবে।”

বাম নেত্রী তথা অধ্যাপিকা নন্দিনী মুখোপাধ্যায়ও এই নিয়ে সরব হয়েছেন। অ্যাডমিট কার্ডে ছবি না থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনিও। তাঁর বক্তব্য, “বর্তমান প্রযুক্তিতে কেন ছবি আপলোড করা যাচ্ছে না, তার কোনও ব্যাখ্যা রয়েছে কি? সেরকম তো কিছু নেই। যখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা হয়, তখনও অ্যাডমিট কার্ডে ছবি ও সই থাকে। যদি অ্যাডমিট কার্ডে ছবি না থাকে, তাহলে কার সঙ্গে কী মিলিয়ে দেখব? আধার কার্ড তো অনেক আগের হতে পারে।”

কটাক্ষ করতে ছাড়েনি গেরুয়া শিবিরও। বিজেপি নেতা সজল ঘোষ বলেন, “সরকারই তো চায় না পরীক্ষা হোক। সরকার চায় মামলা হোক। পরীক্ষা নিলে তো চাকরি দিতে হবে। চাকরি দিলে মাইনে দিতে হবে। কোথা থেকে মাইনে দেবে?”

তাহলে কী বুঝলেন? পরীক্ষা শুরুর আগেই নতুন করে বিতর্কের জালে স্কুল সার্ভিস কমিশন। যদিও কমিশন স্পষ্ট করে দিয়েছে, অ্যাডমিট কার্ডে ছবি না থাকলেও পরীক্ষা দেওয়া যাবে। তবে নতুন করে মামলায় জড়াবে না তো তারা? প্রশ্ন অনেক। উত্তর বোধহয় সময়ই দেবে।
Share To:

kakdwip.com

Post A Comment:

0 comments so far,add yours