উপুড় হস্ত সরকার, কোন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জিএসটি ২.০ তৈরি করল নির্মলা সীতারমনের মন্ত্রক?
কেন্দ্রের তরফে বলা হচ্ছে দেশের মানুষের করের বোঝা কমাতে ও ক্রয় ক্ষমতা বাড়াতে এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাধারণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে বিক্রি বাড়বে দেশের আভ্যন্তরীণ বাজারেও।
কেন্দ্রীয় সরকার GST ব্যবস্থায় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। সাধারণ মানুষ এই সংস্কারের ফলে অনেকাংশেই লাভবান হতে চলেছেন। নতুন এই সংস্করণকে ‘GST 2.0’ বলা হচ্ছে। কিন্তু এই পরিবর্তন শুধুমাত্র যে অর্থনীতির প্রয়োজনেই নিয়ে আসা হয়েছে তেমনটা মনে করছেন না বিশেষজ্ঞদের একাংশ। অনেকে বলছেন, এর পিছনে রয়েছে কিছু রাজনৈতিক হিসাব ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির
গত কয়েক মাস ধরে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা কমেই চলছিল। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই GST-কে সরলীকরণ করা হয়েছে। আগের একাধিক স্ল্যাব কমিয়ে ৫ শতাংশ ও ১৮ শতাংশের মাত্র ২টি স্ল্যাবে GST-কে নামিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। এর ফলে খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ ও বিমার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমবে। আর জিনিসের দাম কমলে সাধারণ ক্রেতা বা উপভোক্তার হাতে থাকবে টাকা। সেই টাকা খরচ করার প্রবণতাও বাড়বে পাল্লা দিয়ে। ফলে, দেশের মধ্যে বিকিকিনির বাজার চাঙ্গা হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার ঠিক এটাই চাইছে।
আবার অন্যদিকে, সিগারেট, মদ ও বিলাসবহুল পণ্যের উপর বসানো হয়েছে চড়া মত্রার ৪০ শতাংশ ‘পাপ কর’। করের এমনতরো নামকরণের মধ্যে দিয়েই বোঝা যাচ্ছে ঘুরপথে নেশা ও বিলাসিতাকে নিরুৎসাহিত করার একটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। সে যাই হোক, এই চড়া মাত্রার করও আবার রাজকোষে বেশ কিছুটা অতিরিক্ত রাজস্ব যোগ করবে তা নিশ্চিত।
সবটা দেখেশুনে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার এই নয়া কর ব্যবস্থা চালু করায় দেশের জিডিপি ১ থেকে ১.২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এখানেই শেষ নয়, অর্থনীতিবিদ অণির্বাণ দত্ত বলছেন, সরকারের সূচক যতই বলুক মুদ্রাস্ফীতি কমেছে, আদতে বাজারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা মোটেই সে কথা বলছে না। এরপরই তিনি যোগ করছেন, জিএসটি-র দ্বিতীয় সংস্করণে কমবে খুচরো বাজারের মূল্যবৃদ্ধি, যা সাধারণ মানুষের জন্য বড় স্বস্তির খবর।
এই পদক্ষেপে সরকারের আনুমানিক রাজস্ব ঘাটতি হবে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু দেশে কেনাকাটা ও লেনদেন বাড়লে সেই ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে নেওয়া যাবে। এ ছাড়াও স্ল্যাব কমানোয় সরল হয়েছে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য কর ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন এই ব্যবস্থা ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’ বা সহজে ব্যবসা করার লক্ষ্য পূরণ করতে সক্ষম।
নিখুঁত রাজনৈতিক অঙ্ক
সামনেই বেশ কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। আর তার আগে, উৎসবের মরসুম শুরুর ঠিক আগেই নতুন এই কর ব্যবস্থা চালু হতে চলেছে। GST ২.০ ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এটাকে মধ্যবিত্ত, কৃষক, যুবক ও মহিলাদের জন্য ‘উপহার’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। ফলে, দরজায় কড়া নাড়া বিধানসভা নির্বাচনগুলোতে এর একটা সুপ্রভাব পড়তে পারে বলেও কেউ কেউ মনে করছেন।
খেয়াল রাখতে হবে, GST চালু হওয়ার পর থেকে বিরোধীরা এটিকে ‘গব্বর সিং ট্যাক্স’ বলে কটাক্ষ করত। এবার এই সরলীকরণের মাধ্যমে সরকার সেই ধারণা কিছুটা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও মত বাজার বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশের। মোদী সরকার এবার GST-কে ‘গুড অ্যান্ড সিম্পল ট্যাক্স’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। তবে, এই সংশোধনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য হল, এই সিদ্ধান্তে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর সরকারেরও সম্মতি রয়েছে। ফলে, বিতর্কের সম্ভবনা ক্ষীণ। তাছাড়া, সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অর্থমন্ত্রীদের নিয়ে এমন সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতার এক উজ্জ্বল বিজ্ঞাপনও বটে।
আন্তর্জাতিক দিক
জিএসটির এই সংস্কার হঠাৎ না হলেও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই এই কর সংস্কার শুরু হয়েছিল। আর সেই সংস্কারের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এমন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি উদ্ভূত হয়েছে যা এই কর সংস্কারকে একেবারে সময়োপযোগী তকমা দিয়েছে। কারণ, কিছুদিন আগেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের উপর ৫০ শতাংশ কর চাপিয়েছেন।
ট্রাম্প যখন ভারতের উপর বাড়তি কর চাপিয়েছেন সেই সময় ভারত তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারকে আরও শক্তিশালী করার দিকে নজর দিয়েছে। ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতির ফলে, যদি ভারত থেকে আমেরিকায় রফতানি কমে যায় তাহলে সেই ঘাটতি কিছুটা অন্তত পূরণ করবে ভারতের দেশীয় বাজার। ফলে, আমেরিকার শুল্কের প্রভাবে আমাদের দেশের অর্থনীতির যা ক্ষতি হবে, তা কিয়দংশে পুষিয়ে দেবে অভ্যন্তরীণ বাজার। আর দেশীয় চাহিদা যদি আরও বৃদ্ধি পায় তাহলে বৃদ্ধি পাবে কর্মসংস্থানও।
‘GST ২.০’-এর ফলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা হয়ত বুঝতে পারবেন যে ভারত সময়ের সঙ্গে কর সংস্কার করছে এবং এই দেশের কর ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, GST ২.০ শুধুমাত্র একটি কর সংস্কার নয়। এটি একদিকে ভারতের অর্থনীতির জন্য একটা দাওয়াই, আবার ভোটমূখী রাজনীতির ব্যাপারটা ধরলে এটি আসলে ভোটারদের উদ্দেশে একটি মন জয় করার বার্তা। এ ছাড়াও বর্তমান আন্তর্জাতিক কূটনীতির দিকে তাকিয়ে একটি দরকারি পরীক্ষামূলক প্রয়োগ নীতি।


Post A Comment:
0 comments so far,add yours