এই সব চরিত্রের মধ্যে উদাহরণ হিসাবে জয়-বীরুর জুটি নিয়ে যদি আমরা আলোচনা করি, একটা দারুণ তত্ত্ব উঠে আসছে। কেউ কেউ জয়-বীরুর জুটি শুধু মাত্র বন্ধুত্বের বেড়া জালে বাঁধতে চাইছেন না। তাঁদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব তো রয়েছেই, কিন্তু বিচ্ছেদের বিরহ ধমনীর উপশিরায় বয়ে গিয়েছে এই দুই চরিত্রের মধ্যে।
জয়-বীরু কি সমকামী?
আকাশ মিশ্র
উত্তম-সুচিত্রার সপ্তপদীর কৃষ্ণেন্দু-রিনা ব্রাউন, দিলীপ কুমার-মধুবালার মোঘল-ই-আজমের আনরকলি-সেলিম থেকে শাহরুখ-কাজলের ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’র রাজ-সিমরন, রুপোলি পর্দার স্বপ্নের জুটি এঁরা। ভারতীয় সিনেমায় এই সব জুটি চিরন্তন। এই জুটির বাইরেও আমরা বেশ কিছু চরিত্র দেখতে পাই, যাঁরা নায়ক-নায়িকা নন, অথচ তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব, প্রেম, খুনসুটি, বিচ্ছেদ- সবই রয়েছে। সেই সব জুটিও কাল্ট। এই ধরুন, ‘শোলে’র জয়-বীরু, থ্রি ইডিয়টসের রাঞ্চো, রাজু, ফারহান কিংবা ‘দিল চাহতা হ্যায়’-এর আকাশ, সমীর ও সিদ্ধার্থ। এদের সম্পর্কের রসায়ন কেমন? এই নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয় সিনেমা সমালোচকদের মধ্যে।
এই সব চরিত্রের মধ্যে উদাহরণ হিসাবে জয়-বীরুর জুটি নিয়ে যদি আমরা আলোচনা করি, একটা দারুণ তত্ত্ব উঠে আসছে। কেউ কেউ জয়-বীরুর জুটি শুধু মাত্র বন্ধুত্বের বেড়া জালে বাঁধতে চাইছেন না। তাঁদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব তো রয়েছেই, কিন্তু বিচ্ছেদের বিরহ ধমনীর উপশিরায় বয়ে গিয়েছে এই দুই চরিত্রের মধ্যে। যাকে ‘ব্রোমান্স’ বলে অ্যাখ্যা দিতে চাইছেন সিনে-সমালোচকদের একাংশ। অবাক হলেন, তাহলে বিষয়টা একটু বিশদে বলা যাক।
এটিও পড়ুন
জেলেই ইমরানকে খুনের 'ষড়যন্ত্র'! কার পথের কাঁটা কাপ্তান?
আজ 'ব্ল্যাক ফ্রাইডে', বেদম সেলে কমদামে জিনিস তো কিনছেন, কিন্তু কেন ব্ল্যাক জানেন?
আধার কার্ড তৈরি বা আপডেট করতে লাগবে কোন নথি! জানেন কি?
Sholey
চলতি বছরেই ৫০ বছরে পা দিয়েছে রমেশ শিপ্পির শোলে। তার উপর সম্প্রতি বলিউড হারিয়েছে তাঁর প্রিয় হিম্যান ধর্মেন্দ্রকে। শোলে নিয়ে তাই ফের আলোচনায় মত্ত সিনেপ্রেমীরা। কেননা, ধর্মেন্দ্র মানেই শোলের বিখ্য়াত সেই পুরুষালি-মারকাটারি বীরু চরিত্রকে আজও ভুলতে পারেনি সিনেপ্রেমিরা। সুঠাম চেহারার ধর্মেন্দ্র, সেই সময় নারীমনে হইচই ফেলে দিয়েছিল বীরু চরিত্রে। ‘টকেটিভ’ বসন্তীর সঙ্গে মাখো মাখো প্রেম থেকে গব্বর সিংয়ের সঙ্গে তুমুল অ্যাকশন। হাত বাঁধা অবস্থাতেও, বসন্তীর ‘ইজ্জত’ বাঁচানোর জন্য বার বার আহত, ক্ষত-বিক্ষত। ঠিক এমনই প্রোটেক্টরকেই তো নারী মন চায়। জেন-জির ভাষায় পারফেক্ট ‘গ্রিন ফ্ল্যাগ’! ঠিক তাঁর উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে শোলের আরেক পুরুষ চরিত্র জয় অর্থাৎ অমিতাভ বচ্চন। ধর্মেন্দ্রর মতো তিনি হিম্যান নন। বরং শান্ত সমুদ্রের মতো। গভীর। অন্তর্মুখী। বুদ্ধিমান। দূরদর্শী। বিধবা রাধার (জয়া বচ্চন) প্রেমে পড়েও কখনও স্পষ্ট করেননি। দূর থেকে দেখে গিয়েছেন তাঁকে। প্রেমেও পড়েছেন নিশ্চুপে। যেখানে ধর্মেন্দ্র ওরফে বীরু তাঁর প্রেমে ইস্তাহার ছড়িয়ে দিয়েছিলেন জলের ট্য়াঙ্কের মাথায় চেপে। সেখানে অমিতাভের প্রেমের খবর একমাত্র পেয়েছিল তাঁর সবচেয়ে কাছের ‘দোস্ত’ বীরু। জয় ও বীরুর দুই চরিত্রের মধ্যেই তফাৎ অনেক। কিন্তু তাঁদের গাঢ় বন্ধুত্বে এই তফাৎ কখনও বাধ সাধেনি। বরং অটুট করে রেখেছিল বন্ধুত্ব। ঠিক এই জায়গা থেকেই সমপ্রেমের তত্ত্বকে টেনে এনেছেন ব্রাত্য বসু। দুই চরিত্রের নির্দিষ্ট কিছু আচরণ (গল্পের প্রয়োজনে), অভিব্যক্তিকেই সমপ্রেমের আতস কাচে ধরেছেন ব্রাত্য।
Sholey (3)
কী উঠে এসেছে ব্রাত্যর ভাবনায়?
টিভি নাইন বাংলা ডিজিটালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রাত্য জানিয়েছেন, তিনি যখন ক্লাস ওয়ানে পড়েন তখন মুক্তি পায় ‘শোলে’। তবে যখন তিনি মাধ্যমিক দিচ্ছেন, তখন প্রথম বলিউডের এই মাইলস্টোন ছবি দেখে হতবাক হয়েছিলেন। মুগ্ধ হয়েছিলেন পরিচালক রমেশ সিপ্পির ক্রাফটম্যানশিপে। কিন্তু সেই সময় বা পরে শোলেকে তিনি এভাবে দেখেননি। বরং গত কয়েক বছরে গে কমিউনিটির বা এলজিবিটিকিউ-এর মুভমেন্ট, তাঁদের বার্তা, দর্শনে ‘শোলে’কে দেখেছেন তিনি। আর তা দেখতে গিয়েই উঠে এসেছে জয়-বীরুর সমপ্রেম তত্ত্ব।
Bratya Basu
প্রথমত, জয়-বীরুর বন্ধুত্বের মধ্যে বীরু অর্থাৎ ধর্মেন্দ্রর চরিত্রটি হচ্ছে হিম্যান (মাসকুলিনিটির রূপক), তাহলে কি জয় অর্থাৎ অমিতাভের চরিত্রটি কি উইম্যান (ফেমিনটির রূপক)? এই প্রশ্নটা উস্কে দেন ব্রাত্য বসু। এই প্রশ্ন ওঠার নেপথ্যেও কয়েকটি কারণ দেখিয়েছেন নাট্যকার। তাঁর কথায়, ‘শোলে’ ছবিতে জয় ও বীরু দুজনেই, দুজনের বিয়েতে বাধা দিচ্ছেন। ধর্মেন্দ্র অর্থাৎ বীরুর উদ্দেশ্য স্পষ্ট, যে সে চাইত না, তাঁর প্রিয় বন্ধু কোনও বিধবাকে বিয়ে করুক। মুখে না বললে্ও, বীরুর অভিব্যক্তিতে প্রথম থেকেই এটা ধরা পড়ে। এমনকী, অমিতাভ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, খোদ পরিচালক রমেশ সিপ্পিও ছবিটি মুক্তির পর ঠিক করেছিলেন নতুন করে শুটিং করে, বিধবার সঙ্গে প্রেম ও বিয়ের আভাসটা সিনেমা থেকে সরিয়ে দেবেন। কিন্তু অমিতাভ অর্থাৎ জয়ের চরিত্রের মোটিভ স্পষ্ট নয়। বসন্তীর প্রেমে যখন হাবুডুব খাচ্ছে বীরু, বিয়ে করার জন্য যখন একেবারে তৈরি। ঠিক তখনই বসন্তীর মাসিকে গিয়ে ধর্মেন্দ্রর চরিত্রের পোস্টমর্টাম করে ফেলেন জয়। উদ্দেশ্য বীরু-বসন্তীর বিয়ে আটকানো। কোন কারণে? ব্রাত্য বলেন, ”প্রথম প্রথম এই দৃশ্য দেখে মজা পেতাম। কিন্তু এখন খুঁজতে চেষ্টা করি, এর নেপথ্যে কী মনস্তত্ত্ব কাজ করেছে। প্রশ্ন ওঠে, এটা কি নিছক একটি বন্ধুর, আরেকটি বন্ধুর সঙ্গে মস্করা করা? তাহলে কি দুজনেই চাইছে তাদের জুড়িদার বিয়ে না করুক! জয়-বীরু জুটি অক্ষত থাকুক? এমনকী, সংলাপেও রয়েছে বীরু, জয়কে জানাচ্ছে, তার বাচ্চারা জয়ের কাছে গল্প শুনতে যাবে এবং বীরুর মুখে এমন কথা শোনায় জয় রীতিমতো রিয়্যাক্ট করে! আমার মনে হয় শোলেকে ফের নতুন ভাবে দেখা উচিত।”
গবেষক ও ফিল্ম সমালোচকের ভাবনা —
International Journal Of Novel research and Development-এর একটি জার্নালে অধ্যাপক কিংশুক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘শোলে’ এবং জয়-বীরুর সম্পর্ককে ‘হোমোইরোটিজম’ নামে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি এই জার্নালে স্পষ্ট করেছেন, ছবিতে প্রায়শই চরিত্র দুটির মধ্যে শারীরিক ঘনিষ্ঠতার মুহূর্তগুলি প্রদর্শিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে স্পর্শ করা, আলিঙ্গন করা এবং এমনকী, একই ‘বিছানা’ ভাগ করে নেওয়ার মতো ঘটনা। যদিও এই কাজগুলিকে সখ্যর প্রকাশ হিসাবে দেখা যেতে পারে, তবে সেগুলির মধ্যে এক ধরনের অন্তরঙ্গতার আভাসও রয়েছে যা কিনা সমপ্রেমকে ইঙ্গিত দেয়।
শুধু তাই নয়, অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্য়ায় তাঁর এই গবেষণাপত্রে লিখেছেন, বীরু ও জয়ের দেহ-ভঙ্গিমা তাদের সম্পর্কের সম্ভাব্য সমকামী-প্রেমমূলক উপস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। বিশেষ করে দুজনের দৃষ্টি বিনিময় এবং তাদের অভিব্যক্তি এমনভাবে পর্দায় ধরা দেয় যা বন্ধুত্বের সীমানাকে অতিক্রম করে।
‘শোলে’ ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৫ সালে। সেই সময় ভারতীয় সিনেমার পর্দায় পিতৃতান্ত্রিকতার জয়জয়কার। ছবির গল্পের কাঠামোও অভিভাবক পিরামিড তত্ত্বের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। মূলত, গরিব প্রেমিক, বড়লোক প্রেমিকার লাভ-রোমান্স এবং পরিবারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, কলেজ প্রেম, ফ্যামিলি ড্রামা কিংবা দেশাত্ববোধক বা আধ্যত্মিকতার সূত্রে বাধা সিনেমার গল্প। মূলত, তখন দর্শক এই ধরনের ফমূর্লা ছবি দেখতেই অভ্যস্ত। ঠিক তারই মাঝে মুক্তি পায় ‘শোলে’। অধ্য়াপক বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের গবেষণাপত্রেও এই বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘শোলে’ (Sholay) সিনেমাটিকে অন্যান্য ছবি থেকে আলাদা করে তোলে এর সম্পর্কগুলোর সূক্ষ্ম চিত্রায়ণ (nuanced portrayal), যার মধ্যে সমকামী-প্রেমমূলক (homoerotic) সম্পর্কের দোটানা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
Sholey (5)
এই ছবিটির পুরুষ চরিত্রগুলোর মধ্যেকার বন্ধুত্ব এবং সখ্যর (friendship and camaraderie) জটিল দিকগুলো তুলে ধরে। এটি দর্শকদের চিরাচরিত পুরুষত্ব (masculinity) এবং বিষমকামিতার (heterosexuality) ধারণা গুলোর বাইরে গিয়ে ভিন্নভাবে সম্পর্কগুলোকে ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেয়।
‘শোলে’-এর সাংস্কৃতিক প্রভাব শুধুমাত্র, এর বক্স অফিসের সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং মূলধারার ভারতীয় সিনেমায় সমকামিতার উপস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা এবং ব্যাখ্যা সৃষ্টি করার সক্ষমতার মধ্যেও নিহিত।
রমেশ সিপ্পির ভাবনা
ফিল্ম সমালোচক ও গবেষকদের আলোচনায় শোলে এবং জয়-বীরুর সম্পর্ক নিয়ে নানারকম মত প্রকাশ্যে আসলেও, ছবির পরিচালক রমেশ সিপ্পি ফিল্ম ক্রিটিকদের এই ভাবনা বা বিশ্লেষণকে একেবারেই তাঁদের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখেছেন। কেননা, তাঁকে প্রশ্ন করা হলে, তিনি স্পষ্ট জানান, ”এটা পুরোটাই দর্শকের নিজস্ব ধারণা বা দৃষ্টিভঙ্গি। ছবির পরিচালক হিসেবে বলতে পারি, আমি কখনই এমন কিছু দেখাইনি বা দেখাতে চায়নি। জয়-বীরুর দারুণ বন্ধুত্বই দেখাতে চেয়েছিলাম। সেই কারণে দুজনের বিপরীতেই নারী চরিত্র রাখা হয়েছিল রাধা এবং বসন্তী। শোলে বা জয়-বীরুর মধ্যে কোনও সমপ্রেমের আভাস নেই বা রাখিনি।”
Sholey (4)
শোলে ছবির শুটিংয়ে রমেশ সিপ্পি, ধর্মেন্দ্র ও অমিতাভ
কী বলছেন সুজয় প্রসাদ?
‘শোলে’র জয়-বীরুর এই বন্ধুত্ব নিয়ে বলতে গিয়ে, ব্রাত্য বসুর থিয়োরিকে নাকচ করলেন অভিনেতা সুজয় প্রসাদ চট্টোপাধ্য়ায়। টিভি নাইন বাংলা ডিজিটালকে তিনি বলেন, ”আমি শোলে ছবিটি দুবার দেখেছি। প্রথম যখন দেখি তখন আমি স্কুলে পড়ি। মায়ের সঙ্গে দেখতে গেছিলাম। ব্রাত্য বসুর বক্তব্যের সঙ্গে আমি একেবারেই সহমত নই। আমার মতে, জয়-বীরুর সম্পর্কটা একেবারে বন্ধুত্বপূর্ণ। একজন বন্ধুর প্রতি আরেকজন বন্ধুর যে, সহৃদয়মানতা, তাঁর বন্ধুত্বের ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ, সেটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সমপ্রেমের কোনও ইঙ্গিত ছিল না। আর এখানে বলতে চাই, সমপ্রেম বলে কোনও বিভাজন বা ক্যাটাগরি হয় না। প্রেমটা প্রেমই হয়। জয়-বীরুর মধ্যে যে প্রেমটা ছিল সেটা একেবারেই বন্ধুত্বের প্রেম। নিপাট বন্ধুত্ব। এছাড়া এদের মধ্যে আর কিছুই ছিল না। ব্রাত্যদার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে। কিন্তু এটা আমার দৃষ্টিভঙ্গি।”
এখানে ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ শব্দটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আসলে জয়-বীরুর সম্পর্ক জলের মতো। এতটাই সরল, সহজ অথচ গভীর। যে পাত্রে রাখবেন, সেই পাত্রেই আকার, রং হয়ে উঠবে জয়-বীরু।


Post A Comment:
0 comments so far,add yours