আওয়ামী লিগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ভারত-বিরোধী অবস্থান নিতে চেয়েছিল। নতুন বাংলাদেশ দাবি করেছিল, ভারতের উপরে নির্ভরতা কমাবে তারা। দুই দেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। তবে ভারতের মুখাপেক্ষি হয়েই থাকতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বরং বলা চলে, বাংলাদেশের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। 


ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘ সময়ের। এই সম্পর্ক বরাবর মিষ্টি হলেও, সেই সম্পর্কে চিড় ধরেছে সম্প্রতি। বলা চলে, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট যখন শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয় এবং মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, তখন থেকেই নতুন বাংলাদেশ যেন ভারত-বিরোধী অবস্থান নিয়েছিল। কখনও কলকাতা, সেভেন সিস্টার্স দখলের হুমকি দিয়েছে, কখনও আবার ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বলেছে। তবে সত্যিই কি ইউনূস জমানায় বাংলাদেশ ভারতের উপরে নির্ভরশীলতা কমিয়েছে? পরিসংখ্যান কিন্তু বলছে অন্য কথা। দেখা যাচ্ছে, ভারত থেকে আমদানি কমানোর বদলে বরং নির্ভরতা আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেই বাংলাদেশে ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে ১৭ শতাংশ। এ কথা ভারত বলছে না, বলছে বাংলাদেশের তথ্যই।




কত আমদানি-রফতানি হল?
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম বণিক বার্তার তথ্য অনুসারে, চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ১০ মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে রফতানি করা পণ্যের মোট মূল্য ছিল ৯৩৯ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এপ্রিল থেকে জানুয়ারি মাসের মধ্যে বাংলাদেশে ভারত থেকে পণ্য আমদানি হয়েছে ৮৮০ কোটি ৯৯ লাখ ডলারের। শুধু গত জানুয়ারিতেই ভারত থেকে বাংলাদেশ পণ্য আমদানি করেছে ১০৭ কোটি ৫৬ লাখ ৭০ হাজার ডলারের। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আমদানির পরিমাণ ছিল ৯১ কোটি ৭৩ লাখ ডলার।

কী কী পণ্য কেনা-বেচা হয়?
ভারত থেকে বাংলাদেশ সবথেকে বেশি তুলো কেনে। এরপরেই রয়েছে চাল ও সবজি সহ বিভিন্ন খাদ্যশস্য। এছাড়াও বিভিন্ন খনিজ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিষেবাও আমদানি করে বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশ ভারতে সবথেকে বেশি রফতানি করে পোশাক।

আওয়ামী লিগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ভারত-বিরোধী অবস্থান নিতে চেয়েছিল। নতুন বাংলাদেশ দাবি করেছিল, ভারতের উপরে নির্ভরতা কমাবে তারা। দুই দেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। তবে ভারতের মুখাপেক্ষি হয়েই থাকতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বরং বলা চলে, বাংলাদেশের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। 

কেমন সেই নির্ভরতা, একটু দেখা যাক। বাংলাদেশ বিগত কয়েক বছরে চাল সহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি কমাবে বললেও, বাস্তবে তা বেড়েছে। ভারত চাল রফতানি শুল্ক কমাতেই গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে বিভিন্ন স্থলবন্দর থেকে ব্যক্তিগত খাতে ভারতীয় চাল আমদানি শুরু হয়। ৪ ও ১৮ ডিসেম্বরে দুই দফায় সরকারিভাবে মোট ১ লাখ টন নন-বাসমতী সিদ্ধ চাল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়।

মহম্মদ ইউনূসের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকারও জি-টু-জির ভিত্তিতে বাংলাদেশে চাল আনা শুরু করে ২৬ ডিসেম্বর। জানুয়ারি মাসে আরও ৫০ হাজার টন চাল সরকারিভাবে আমদানি করার অনুমোদন দেয় ইউনূস সরকার। গত ২০ ফেব্রুয়ারি আরও ৫০ হাজার টন চাল আমদানির অনুমোদন দেয় সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি। আলাদাভাবে বেসরকারিভাবে চাল আমদানিও চলছে। 

কেন ভারতকে ছাড়তে পারে না বাংলাদেশ?
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক যতই খারাপ হোক না কেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির বাস্তবতা অস্বীকারেরও যে উপায় নেই, তা বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন। বণিক বার্তাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারেই তিনি ভারত-চিনের সম্পর্কের উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন যে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত হলেও, বাণিজ্য হয় বিপুল। একইভাবে আমেরিকার সঙ্গে চিনের সম্পর্কও তাই। অর্থনৈতিক সম্পর্কসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু বিষয় রাজনৈতিকীকরণ হয় না। অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি বলেছিলেন, “আন্তঃনির্ভরশীলতার যুগে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকারের সুযোগ নেই। জনমানসে এক ধরনের ধারণা থাকবেই। কিন্তু যারা নীতি প্রণয়নকারী, যারা দেশ পরিচালনা করবেন; অনেক বিষয়েই তাদের খুব বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেখানে অর্থনৈতিক যুক্তির বিষয় থাকে।”

বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের পর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে আসেন। বাংলাদেশে চাইছে, হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করুক ভারত। এই নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চাপান-উতোর বেড়েছে। তবে এই কারণে বাংলাদেশের ভারতের উপরে বাণিজ্য নির্ভরতা কমানো সঠিক সিদ্ধান্ত নয় বলেই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের যুক্তি, ভারতের বিকল্প বাজার এখনও খুঁজে পায়নি বাংলাদেশ। আর এই বিকল্প খোঁজাও এত সহজ নয়।

বাংলাদেশের তিনদিক থেকে সীমান্ত ঘেরা অবস্থান, খাদ্য ও জ্বালানি আমদানি এবং পোশাক শিল্পের কাঁচামাল নির্ভরতা সহ নানা কারণে বাংলাদেশের ওপর ভারতের ভূ-অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েইছে। এবং এই প্রভাব শেখ হাসিনার আমলেই বেড়েছে। বিগত এক বছরে দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েন কূটনৈতিক স্তরেও প্রভাব ফেললেও, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তেমন প্রভাব পড়েনি।

কতটা প্রভাব পড়ল আমদানি-রফতানিতে?
ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে (এপ্রিল-মার্চ) ভারত বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ১৪৯ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রফতানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১০৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ গত অর্থবর্ষে রফতানি বৃদ্ধি হয়েছে ৩ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানই বলছে যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি বজায় রয়েছে, এমনকী, তা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি বন্ধ করার পর আগে যেখানে দিনে ৩০০-৪০০ ট্রাক ঢুকত, এখন তা ১৫০-এ নেমে দাঁড়িয়েছে। তবে দুই দেশের বাণিজ্য মহলেরই আশা, বাংলাদেশ নির্বাচিত সরকার গঠিত হলে, পরিস্থিতি বদলাবে।

এক্ষেত্রে এটাও নজরে রাখার বিষয় যে বাংলাদেশে যখনই খাদ্যশস্য বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সঙ্কট দেখা দেয়, তখন ভারতই আমদানির ভরসা হয়ে ওঠে। চাল ও পেঁয়াজ তার উৎকৃষ্ঠ উদাহরণ। বাংলাদেশে সরকার পতনের পর যখন অস্থির অবস্থা তৈরি হয়েছিল, তখন বাণিজ্যও প্রভাবিত হয়েছিল। বাংলাদেশে হু হু করে চাল, আলু. পেঁয়াজের মতো জিনিসের দাম বাড়ছিল। শেষে পশ্চিমবঙ্গের হিলি ও বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে ফের আমদানি শুরু করতে দাম কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসে। 

আবার রেডিমেড পোশাক রফতানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সেখানে ৫০০-রও বেশি সুতোকল রয়েছে। কিন্তু এই সুতোকলে ব্যবহারের জন্য সুতো আসে ভারত থেকেই। এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সরকার সুতো আমদানি বন্ধ করে দেয়। তারপরও কিন্তু আমদানি কমেনি। স্থল বন্দরের বদলে সমুদ্র বন্দর থেকে সুতো আমদানি শুরু হয়। আগে প্রতি মাসে গড়ে ৫ কোটি কেজি সুতা আসত। বিধিনিষেধ আরোপের পর মে ও জুনে এসেছে গড়ে ৪ কোটি কেজি।
Share To:

kakdwip.com

Post A Comment:

0 comments so far,add yours