পুরনো মেট্রো পথ নিয়ে কর্তৃপক্ষ এতটাই চিন্তিত যে প্রধানমন্ত্রী যেদিন এয়ারপোর্টের মেট্রোতে চেপে উদ্বোধন পর্ব সারলেন, ওইদিনই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসলেন রেলবোর্ডের চেয়ারম্যান সতীশ কুমার।

কলকাতাবাসীর এক অন্যতম গর্বের নাম মেট্রো। একসময় যাকে বলা হত ‘পাতাল রেল’। মাটির তলা দিয়ে ট্রেন ছুটে যাওয়া কলকাতাবাসীর কাছে ছিল স্বপ্নের মতো। আজ সেই পাতাল রেল মাটি ফুঁড়ে অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে। একসময় যে মেট্রো জুড়ে দিয়েছিল কলকাতার উত্তর আর দক্ষিণকে, আজ সেই মেট্রোই জুড়ে দিচ্ছে দুই ২৪ পরগনাকে। হাওড়া থেকে সেক্টর ৫ মেট্রো পেয়ে যেন হাতে চাঁদ পেয়েছেন যাত্রীরা। শহরের যে কোনও প্রান্ত থেকে এয়ারপোর্ট পৌঁছনোও খুব সহজ। সবুজ পতাকা নেড়ে চালু করা হল একের পর এক মেট্রো, কিন্তু কলকাতার সেই গর্বের পাতাল রেল কেমন আছে, সেই খবর কে রাখে! জানেন ওই সুড়ঙ্গে লুকিয়ে আছে কোন বিপদ? প্রতিদিন কতটা ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন যাত্রীরা? কী উঠে এল সার্ভে রিপোর্টে?


কয়েকদিন আগে কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশনের পিলারের ফাটল দেখা গিয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে স্টেশন। এটা তো মাত্র ১৫ বছর আগে তৈরি হওয়া স্টেশন। তারই এই হাল। তাহলে ৪০ বছর আগে যে মেট্রো পরিষেবা দেওয়া শুরু করেছিল, তার ক্ষত কতটা গভীর? সম্প্রতি সেই খোঁজ নেয় মেট্রো কর্তৃপক্ষ। আর সেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে গিয়ে মেট্রো কর্তাদের চোখ কপালে! প্লাটফর্ম থেকে লাইন, সবকিছুরই বেহাল অবস্থা!




১৯৮৪-তে এই কলকাতাতেই তৈরি হয়েছিল দেশের প্রথম মেট্রো। দিল্লিতে মেট্রো তৈরির সময় যেভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এগিয়ে এসেছিল, কলকাতার ক্ষেত্রে কিন্তু তেমনটা ছিল না। একেবারেই দেশীয় প্রযুক্তিতেই ইঞ্জিনিয়াররা তৈরি করেছিলেন এই সুড়ঙ্গ পথ। প্রথম মেট্রো চালু হয়েছিল ভবানীপুর (নেতাজি ভবন) থেকে এসপ্লানেড পর্যন্ত। পরবর্তীতে একদিকে লাইন বাড়িয়ে দমদম পর্যন্ত করা হয়, আর দক্ষিণ কলকাতার দিকে টলিগঞ্জ পর্যন্ত লাইনটি বাড়ানো হয়। সেটাও ১৯৮৬ সালের কথা বলছি।

তারপর থেকে কিন্তু দীর্ঘ সময় শুধুমাত্র দমদম এবং টালিগঞ্জের মধ্যে মেট্রো চলাচল করেছে। এর আর কোনও এক্সটেনশন ছিল না। মূলত কলকাতাবাসীদের কাছে উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণ কলকাতায় যাওয়ার জন্য এটা ছিল একটা অন্যতম পথ। এছাড়া শহরতলীর মানুষজন কলকাতায় এলে শখেও মেট্রো চড়তেন, কারণ পাতাল রেল ছিল একটা বিস্ময়। বোঝাই যাচ্ছে যে টলিগঞ্জ-দমদম মেট্রো লাইনের বয়স ঠিক কতটা বেড়েছে।

ভাল নেই মেট্রো

কখনও কখনও কিছু রেকের সমস্যা ছাড়া আর তেমন বড় কোনও অঘটন কখনও ঘটেনি ওই রুটে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে কয়েকটা ছবি মেট্রোর কর্তাদের রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে।

গত বছরের মে মাসের কথা। এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখল কলকাতা মেট্রো। মেট্রো স্টেশনের ভিতর হাঁটুজল। থমকে গেল পরিষেবা। বৃষ্টি হলে রেললাইনে জল দাঁড়িয়ে যায় এবং তার জন্য রেল পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়, এটা তো চেনা ছবি। কিন্তু মেট্রোতে মাটির তলায় যে লাইন, যার চারপাশ দিয়ে একেবারে কংক্রিটের দেওয়াল তৈরি করা আছে, সেখানে জল ঢুকল কী করে? এটা পার্ক স্ট্রিট স্টেশনের কথা।

কিন্তু এটাই শেষ ঘটনা নয়। অতি সম্প্রতি যখন নাকি বিমানবন্দর বা হাওড়া-সেক্টর ৫ লাইনের নতুন নিয়ে কলকাতা জুড়ে একেবারে সাজো সাজো রব, তার মধ্যেও দেখা গেল সেই একই ছবি। ঠিক যেদিন প্রধানমন্ত্রী কলকাতায় এসে তিনটি নতুন রুটের মেট্রো উদ্বোধন করে গেলেন, তার ঠিক পরের দিনই আপ ও ডাউন দুটো লাইনেই লাইনের উপর জল উঠে আসে। আবারও থমকে যায় মেট্রো। কালীঘাট, যতীন দাস পার্ক এবং নেতাজি ভবন স্টেশনের মাঝের ট্র্যাকে জল উঠে যায়।

চাঁদনী চক ও সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশনের মাঝে, পার্ক স্ট্রিট, কালীঘাট-যতীন দাস পার্ক মেট্রো স্টেশনের মাঝে সুড়ঙ্গের ভিতরে বারবার জল দাঁড়িয়ে বিপর্যস্ত হচ্ছে মেট্রো পরিষেবা। তাই এই সুড়ঙ্গপথ নিয়ে বাড়ছে চিন্তা।

নির্মাণ বিশেষজ্ঞ পার্থপ্রতিম বিশ্বাস এই বিষয়ে বলেন, “মেট্রোর ভিতরে যেভাবে জল ঢুকছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে হচ্ছে না।”

যেহেতু বিপদের আশঙ্কা থাকে, তাই জল ঢুকলে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দিতে হয়। ফলে থমকে যায় পরিষেবা। কেন এমন হচ্ছে বারবার? এটা কিন্তু নিছকই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাস্তব ছবিটা কিন্তু সত্যিই বিপজ্জনক। টালিগঞ্জ-দমদম টানেলের মধ্যে যে সত্যিই লুকিয়ে আছে বিপদ, সেটা বলছে সার্ভে রিপোর্ট।

মেট্রোর সার্ভে রিপোর্ট

রাইটস নামক সমীক্ষক সংস্থাকে দিয়ে সুড়ঙ্গ পথের সার্ভে করানো হয়েছিল। রিপোর্টে তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এক, মেট্রোর লাইন বা ট্র্যাক। দুই, ডি-ওয়ালসহ মাটির নীচের সুড়ঙ্গের বর্তমান অবস্থা। আর তিন হল, প্ল্যাটফর্ম এবং পিলার। মেট্রো সূত্রে খবর, সিংহভাগ মেট্রো স্টেশনের রিপোর্ট তৈরি হয়ে গিয়েছে। হাতেগোনা কয়েকটির স্টেশনের রিপোর্ট দেওয়া বাকি। ইতিমধ্যেই সেই রিপোর্ট জমা পড়েছে। রিপোর্ট থেকে স্পষ্ট যে মেট্রো স্টেশন গুলির দ্রুত সংস্কার না হলে কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশনের মত বিপর্যয় আটকানো সম্ভব হবে না। মেট্রো সূত্রে জানা যাচ্ছে, মাটির তলায় মেট্রোর লাইনের অবস্থা এমনই যে দ্রুত গতিতে ট্রেন চালানো যাচ্ছে না!। এক একটি রেক যেখানে ৮০ কিমি পার আওয়ার গতিতে চালানো যায়, সেখানে অবস্থা এতটাই প্রতিকূল যে রেকের গতি ৫৫ কিমি করে চালাতে হচ্ছে।

সুড়ঙ্গে মেরামত কীভাবে!

রিপোর্ট দেখে আর দেরি করেনি কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যেই টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে দিয়েছে কলকাতা মেট্রো কর্তৃপক্ষ। সেখানে নির্দিষ্ট করে প্রতিটি বিষয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে মেট্রোর তরফে। সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশন থেকে কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত প্লাটফর্ম, মেট্রো ট্র্যাক বা লাইন, এসি ভালভ থেকে শুরু করে যাবতীয় পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামতির কাজে এই টেন্ডার ডাকা হয়েছে। মোট কাজের টেন্ডার মূল্য ধরা হয়েছে ৮৯ লক্ষ ৭৫ হাজার ৫০ টাকা। সময়সীমা ধরা হয়েছে ন’মাস। এই সময়সীমার মধ্যেই সব কাজ শেষ করতে হবে বলে মেট্রো তরফে টেন্ডারে জানানো হয়েছে। কলকাতা মেট্রোর জেনারেল ম্যানেজার পি উদয় রেড্ডি বলেন, “রিপোর্ট ধরা পড়েছে। অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু হবে।”

শুধু তাই নয়, পুরনো মেট্রো পথ নিয়ে কর্তৃপক্ষ এতটাই চিন্তিত যে প্রধানমন্ত্রী যেদিন এয়ারপোর্টের মেট্রোতে চেপে উদ্বোধন পর্ব সারলেন, ওইদিনই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসলেন রেলবোর্ডের চেয়ারম্যান সতীশ কুমার। শুক্রবার দীর্ঘক্ষণ এই বৈঠক চলে। কলকাতা মেট্রোর জেনারেল ম্যানেজার থেকে শুরু করে শীর্ষ কর্তা এবং আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন সেখানে। ডি-ওয়াল থেকে জল বেরিয়ে এসেছে কীভাব সেটা নিয়েই এদিন পর্যালোচনা করেন রেল বোর্ডের চেয়ারম্যান। চার দশক পুরনো এই মেট্রো করিডরের মূল সমস্যা কোথায় হচ্ছে, তার শিকড় খুঁজে দ্রুত মেরামতের নির্দেশ দেন। ধাপে ধাপে মেট্রো স্টেশনগুলি মেরামত করা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন রেলবোর্ডের চেয়ারম্যান। টাকার ব্যাপারটাও নিশ্চিত করেছেন তিনি।

তবে এই ক্ষেত্রেও রয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। তৃণমূল সাংসদ মালা রায় বলেন, “রেল যথেষ্ট টাকা দেয় না, তাই এই অবস্থা।”

তবে সব বিতর্ক দূরে রেখে যাত্রী সুরক্ষাই এখন মূল বিষয়। প্রশ্ন হল, যদি ওই পুরনো মেট্রো পথ মেরামত করা হয়, তাহলে কি পরিষেবা বন্ধ রাখা হবে? লক্ষ লক্ষ যাত্রী কতটা অসুবিধায় পড়বেন? মেরামতির কাজ শুরু হলে, তবেই হয়ত সবটা স্পষ্ট হবে।
Share To:

kakdwip.com

Post A Comment:

0 comments so far,add yours