স্কুল? স্কুলের ক্লাস ছুটি, বাড়িতে পড়ুয়ারা। আর স্কুলে কচিকাচাদের বদলে নেতা-নেত্রী, আধিকারিকদের মুখ! একাধিক স্কুলে এই সময় চলে অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা, সেটাও বিঘ্নিত হচ্ছে! এহেন এক গুচ্ছ অভিযোগ সাম্প্রতিককালে এসেছে সামনে।


 স্কুলেই এখন 'আমাদের পাড়া...', মাইক ছাপিয়ে আদৌ পড়ুয়াদের কানে পৌঁছচ্ছে স্যরের কথা!
স্কুলেই সরকারি ক্যাম্প!

 একুশে জুলাই তৃণমূলের সমাবেশের পরদিনই নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ নামে এক নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য, সরকারি পরিষেবা এবং এলাকার সমস্যার সমাধানকে বুথ স্তরে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু সেই প্রকল্প কোথায় হচ্ছে? খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, একাধিক জেলায় বিভিন্ন স্কুলেই চলছে এই প্রকল্প! তারস্বরে বাজছে মাইক, চেয়ার টেবিল পেতে বসে সরকারি আধিকারিকরা, সঙ্গে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও। আর স্কুল? স্কুলের ক্লাস ছুটি, বাড়িতে পড়ুয়ারা। আর স্কুলে কচিকাচাদের বদলে নেতা-নেত্রী, আধিকারিকদের মুখ! একাধিক স্কুলে এই সময় চলে অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা, সেটাও বিঘ্নিত হচ্ছে! এহেন এক গুচ্ছ অভিযোগ সাম্প্রতিককালে এসেছে সামনে।

মিড ডে মিল খেয়েই বাড়ি!




একদিকে মাইক, একদিকে ক্লাস!

কুলতলির মৈপীঠের বৈকুন্ঠপুর হাই স্কুলে মঙ্গলবার ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ শিবিরের আয়োজন হয়। শিবিরে উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা শাসক সুমিত গুপ্তা। এছাড়াও ছিলেন স্থানীয় বিধায়ক, সাংসদ, পুলিশ সুপারও। অভিযোগ, স্কুল চলাকালীনই এ দিন স্কুল চত্বরে মাইক বাজিয়ে শিবির চলে। স্কুলের মধ্যে মাইক বাজানোয় পড়তে অসুবিধা হয় বলে অভিযোগ করে পড়ুয়ারাও।

একই ছবি কার্যত দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলিতে। কুলতলির সরকারি স্কুলে DM ও SP উপস্থিতিতে মাইক বাজিয়ে পাড়ার সমাধানের শিবির। অভিযোগ, মাইকের আওয়াজে স্কুলে বন্ধ হয় পঠন পাঠন। জেলাশাসকের উপস্থিতিতে স্কুল চলকালীন মাইক চালিয়ে সরকারি শিবির চলানোর অভিযোগ উঠেছে।

মর্নিংয়ে ক্লাস, ডে স্কুল ছুটি!

কেবল দক্ষিণবঙ্গে নয়, উত্তরবঙ্গেও একই ছবি। ধূপগুড়িতে স্কুল ছুটি দিয়ে প্রশাসনিক ক্যাম্প করার অভিযোগ ঘিরে চরম বিতর্ক। সোমবার ধূপগুড়ির বৈরাতিগুড়ি হাইস্কুলে অনুষ্ঠিত হয় ক্যাম্প। পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের তিনটি বুথের মানুষের জন্য এই ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছিল। সূত্রের খবর, শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। কিন্তু পরে প্রকাশ্যে আসায় বিতর্কের সূত্রপাত। অভিযোগ, বৈরাতিগুড়ি হাইস্কুল চত্বরেই রয়েছে প্রাথমিক স্কুল,সেই সকালের স্কুলে পড়াশোনা স্বাভাবিকভাবে হলেও উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্লাস আর হয়নি। ক্যাম্পের কারণে কার্যত স্কুল ছুটি ঘোষণা করে দেওয়া হয়।

সরব বিরোধীরা

এই ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন বিরোধীরা। তাঁদের বক্তব্য, এমনিতেই সরকারি স্কুলগুলো অনেক দিন ছুটি থাকে। তার ওপর শিক্ষক শিক্ষিকার ঘাটতি, ক্লাস ঠিক মতো হয়, এহেন একাধিক অভিযোগ ওঠে প্রত্যন্ত গ্রামের একাধিক স্কুলগুলোর ক্ষেত্রে। তার ওপর যদি স্কুলেই এই ধরনের ক্যাম্প খুলে বসা হয়, তাহলে তো পড়াশোনার আরও ক্ষতি। তারস্বরে মাইক বাজলে শিক্ষকরাও বা পড়াবেন কীভাবে? বিজেপি নেতা দেবজ্যোতি সিংহ রায় অভিযোগ করে বলেন, “স্কুল চলাকালীন স্কুলের মাঠে সরকারি অনুষ্ঠান করা, মাইক বাজিয়ে ক্লাস বন্ধ করা—এসব কেবল তৃণমূল আমলেই সম্ভব।” যদিও তৃণমূলের আবার বক্তব্য, “স্কুল বন্ধ হয়নি। সরকারি কর্মসূচির সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও যুক্ত হয়েছে।”

‘পঠনপাঠন স্বাভাবিকই রয়েছে’

যদিও তৃণমূলের বক্তব্য, ক্লাস কখনই বন্ধ রেখে কিছু করা হয়নি। পঠনপাঠন স্বাভাবিকই রয়েছে। এই ধরনের ক্যাম্প তো আর প্রতিদিন হয়না।

কী বলছেন প্রধান শিক্ষকরা?

স্কুলে এহেন ক্যাম্প চললে যে পঠনপাঠনের সমস্যা হয়, সেটা স্বীকারও করছেন প্রধান শিক্ষকরা। তার মধ্যে এই সময় আবার অনেক স্কুলে পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড দেওয়া হচ্ছে। তাই ক্লাস না হলেও স্কুলের অন্যান্য কাজ হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক পদে কর্মরত বিশ্বজিৎ মণ্ডলের বক্তব্য, “একই সঙ্গে তো দুটো বিষয় হয় না। একদিকে মাইক বাজছে, আরেকদিকে স্কুল চলবে, ক্লাস হবে, সেটাও সম্ভব নয়। তাই ক্লাস সাসপেন্ড করা হচ্ছে। কিন্তু স্কুল ছুটি নয়। মিড ডে মিলের পর থেকে সাসপেন্ড করা হচ্ছে ক্লাস।”

৩ নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত এই কর্মসূচির শিবির চলবে। ততদিন স্কুলের পঠনপাঠন এইভাবেই চলবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষাবিদরা।
Share To:

kakdwip.com

Post A Comment:

0 comments so far,add yours